সংবাদ শিরোনাম
DSE

নবান্নের উৎসবে মেতে উঠতে ঘুরে আসুন চলনবিল থেকে

qq

চলন বিলের নাম শুনেন নি এমন একজন বাংলাদেশী খুঁজে পাওয়া যাবে না । সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলায় ঐতিহাসিক চলনবিলের অবস্হান । চলনবিল দৈর্ঘ্যে ৩৩ কিলোমিটার প্রস্থে ১৫ কিলোমিটার । সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, উল্লাপাড়া, নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলা, গুরুদাসপুর উপজেলা, পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলা, ফরিদগঞ্জ উপজেলা, ভাঙ্গুড়া উপজেলার সমন্বয়ে চলনবিল অঞ্চল গঠিত । চলনবিল একটি নিম্নভূমি এলাকা । অতীতকালে এই বিল অনেক গভীর ও অত্যন্ত বিপদসংকুল ছিল । অনুমান করা হয় যে, প্রায় ৪০০ বৎসর পূর্বে এই বিলটি রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া জেলার অধিকাংশ স্থান জুড়ে ব্রম্মপুত্র ও পদ্মার সঙ্গমস্থলে উত্তর পশ্চিম অংশে বিস্তৃত ছিল । কালের পরিক্রমায় পলি জমে বিলটি ভরাট হয়েছে এবং এর বিভিন্ন চরে বিভিন্ন চরে গ্রাম গড়ে উঠেছে । ইহার অবস্থান, আকৃতি, প্রকৃতি, দেখে চলন বিলকে উত্তর বাংলার নদ নদীর স্নায়ুজালের নাভীকেন্দ্র বলা যায় । সার্বক্ষণিক বিশাল বিলের পানি চলনমান বা প্রবাহমান থাকার কারণে এই বিলের নাম হয়েছে চলন বিল । তাহলে চলে আসুন আমাদের প্রিয় সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলায় । তাড়াশ উপজেলা সিরাজগঞ্জ জেলা সদর হতে প্রায় ৪০ কিঃ মিঃ পশ্চিমে এই ঐতিহাসিক চলনবিলের মধ্যে অবস্থিত ।
ষড়ঋতুর দেশ এই বাংলায় ভাদ্র আর আশ্রিণ এই দুই মাস শরৎকাল । শরৎ এর পরে এসে গেছে হেমন্তকাল । হেমন্তের এই মাসে (নভেম্বর মাসে) নবান্নের উৎসব চলছে চলন বিল অধিকৃত এই জনপদে, তাহলে আর দেরী কেন? চলুন ঘুরে আসি । এই অঞ্চলে বেড়াতে আসলে দারুন আনন্দ পাবেন আপনি । চলন বিলের আশপাশের একটু উঁচু অনাবাদি জমিতে দিনভর বাতাসে দোল খাচ্ছে কাশফুল । আর কাশবনের পাশ দিয়ে ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জে রেলপথে ভ্রমণ করলে ভ্রমণের সময় পাশেই দেখতে পাবেন সারি সারি কাশ বন । ‘কাশের বনে ঢেউ খেলিয়ে তুফান মেল যায় ঐ আমার তুফান মেল যায়’ গানের কথাগুলো আপনার মনে পড়বে এতে কোন সন্দেহ নাই । এই হেমন্তে (নভেম্বর মাসে) বেড়ানোর জন্য আপনি নিশ্চিন্তে বেছে নিতে পারেন তাড়াশ, গুরুদাসপুর কিংবা এর আশপাশের এলাকাগুলোকে আর নৌকা ভ্রমণ করতে পারেন চলন বিলে । হেমন্ত ঋতুতে (নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে) তাড়াশের প্রাণভ্রমরা চলনবিলের রূপের কোনো তুলনাই হয় না । গাছে গাছে কত না রঙের ফুল । কামিনী, কদম, শিউলি, হাসনাহেনা ফুটে সুঘ্রাণ ছড়াচ্ছে দিনে ও রাতে সমান তালে । হেমন্তের ছায়া ঢাকা মায়া মাখা নাটোরের সিংড়া, গুরুদাশপুর, পাবনার চাটমোহন, সিরাজগঞ্জের বারুহাস, তাড়াশের চৌগ্রাম, গ্রামগুলো যেন একএকটি ছবির মতো । রুপের এই বণ্যাছটা দেখে হয়তো আপনার চোখে ভেসে উঠবে জীবনানন্দ দাসের কবিতার কল্পনার জগতের নায়িকা বললতা সেনের মুখচ্ছবি, আর বলবেন, “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার দিশা,/মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য;/অতি দূর সমুদ্রের পর হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা,/সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,/তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে;/বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?/পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন” । এখানে এই চলন বিলের পাড়ে বসেই হয়ত কবি জীবনানন্দ দাস তাঁর সেই অমর কবিতাখানি রচনা করেছিলেন ।
এছাড়া এর আশ পাশে রয়েছে নদনদী ও খালবিল । এ সবকিছুই বয়ে গেছে চলনবিলের ওপর দিয়ে । হেমন্তের এই সময়ে চলন বিল অঞ্চল অফুরন্ত জল থৈ থৈ করছে । আকাশে কে যেনো রং তুলি নিয়ে সাদা আর নীলের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে । আত্রাই, গুড়, বারনাই, বড়াল, তুলসী, চেঁচুয়া, ভাদাই নদীতো বয়ে গেছে চলনবিলের ওপর দিয়ে । মেঘ কালো হলেই মনে হয় অঝোর ধারায় নেমে আসবে বর্ষণধারা । এখন নৌকা ভাড়া করে আপনি দূরে, বহু দূরে চলে যেতে পারবেন । এভাবে নৌকায় ভ্রমণ করতে চাইলে আমাদের গ্রুপে ইভেন্ট তৈরী করে গেলে ভালো হবে । অনেকজন হলে মজা বেশী পাওয়া যায় । চলনবিলে নৌকায় তিন থেকে চার রাত কাটিয়ে দারুণ আনন্দ উপভোগ করা যায় । নৌকা যখন কোনো তীরে এসে ভিড়বে, তখন পাশে দেখবেন সাদা কাশফুল । সুযোগ পেয়ে কাশেরা পুরো এলাকা জুড়েই বসতি গেড়েছে । কাশবনে পাখিরা সকাল বিকাল আড্ডা দেয় । মন তখন আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠবে । হয়তো মনে জেগে উঠবে, ‘বরষার জল সরিয়া গিয়াছে, জাগিয়া উঠেছে চর, শালিকেরা গত’ খুঁড়িয়া বাঁধিতেছে ঘর” । তিন থেকে চার দিনের জন্য নৌকা ভাড়া নেবে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা । রান্নাবান্না হবে নৌকাতেই । সে কি আনন্দ! হেমন্তের আকাশ এখন পরিষ্কার । বৃষ্টির কোন সম্ভাবনা নাই । কোনো তীরে নেমে মাটিতে পা রাখলে কাছ থেকে দেখা যাবে শিউলি ফুল ।
সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশে দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই । এখানকার অন্যতম আকর্ষণ কপিলেশ্বর শিব মন্দির, রাধা গোবিন্দ মন্দির, রশিক মন্দির, বড় কুঞ্জবন দীঘি, উলিপুর দীঘি, মথুরা দীঘি, মাকরসন দীঘি । বিনসারায় গিয়ে কয়েকটি কূপও দেখবেন, একটি কূপের নাম ‘জীয়ন কূপ’ । এই কূপটি বড় অদ্ভুত ধরনের । বড় বড় আগলা ইটের গাঁথুনি দিয়ে এটি নির্মিত হয়েছে । ওখানে গিয়ে লোকমুখে আরও জানবেন, বাছো বানিয়া মনসা পূজারী ছিলেন । ‘দুধপুকুর’ নামে তার একটি পুকুর ছিল । পুকুরটি সাপদের জন্য নাকি দুধে ভর্তি থাকত । এখনও আছে দুধপুকুর, তবে সেখানে দুধ নেই, সাপও নেই । দুধপুকুর দেখার সময় তবুও কেন জানি ভয় ভয় লাগবে । সাপ না দেখলেও এখানকার জঙ্গলে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকে সাপ, যা রাতের বেলা বের হয়ে আসে । তা সত্ত্বেও বেড়াতে এসে চারদিকের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়বেন । তাড়াশের কাছে পিঠে বারুহাস গাঁওখানি প্রাচীন ও জমিদার প্রসিদ্ধ গ্রাম । এখানে গিয়ে একটি ইমামবাড়ার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাবেন । এটি শাহ সুজার আমলে নির্মিত হয়েছিল । এখানে একজন দরবেশের মাজার আছে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন । পঙ্খিরাজ ঘোড়ার পিঠে তরবারি হাতে মানুষের ছবি বাংলোটির গায়ে থাকায় এটি মুসলিম কীর্তির নিদর্শন বলে অনেকে মনে করেন । মোগল আমলে ইমাম-মোয়াজ্জেমের হুজরাখানার জন্য এরূপ বাংলো নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায় । চৈত্র মাসের পূর্ণিমার দিন বারুহাস গ্রামে বিরাট মেলা বসে । বারুহাস গাঁয়ে ঘুরতে ঘুরতে যদি শেফালি গাছের তলায় আসেন, তখন ঝকমকে আকাশ, ঝলমলে রোদ খুঁজে পেলে তো কথা নেই । আকাশে তাকিয়ে দেখুন, হয়তো দেখবেন হেমন্তে সারা আকাশে শুভ্র মেঘের তুলার মতো বারিহারা মেঘেরা অবিরাম ছোটাছুটি করছে । সিরাজগঞ্জে আরো অন্যতম দশ’ণিয় স্হান যথাক্রমে যমুনা বহুমুখী সেতু (বঙ্গবন্ধু সেতু), যমুনা রিসোট’, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাশ্বে’ অবস্হিত ইকোপাক’, জয়সাগর দীঘি, ছয়আনি পাড়া দুই গম্বুজ মসজিদ, মক্কা আউলিয়া মসজিদ, বাঘাবাড়ি নদী বন্দর, শহর রক্ষা বাঁধ হাড’ পয়েন্টের যমুনা নদীর পাড় ইত্যাদি স্হান ।
যেখান থাকবেনঃ
তাড়াশে রাত্রিযাপন করার জন্য ডাকবাংলো রয়েছে । তাড়াশ থানার কাছেই ডাকবাংলো পাবেন । এছাড়া গণকল্যাণ সংস্থা এবং সরকারি বিভিন্ন বিভাগের বাংলো রয়েছে । অপরদিকে নাটোরের সিংড়ায় রয়েছে সরকারী ডাকবাংলো এবং পৌরসভার ভিআইপি গেষ্ট হাউস । চাইলেই সেখানে রাত্রি যাপন করতে পারবেন ।
যেভাবে যাবেনঃ
সহজ যোগাযোগের মাধ্যম সমূহ হচ্ছে সড়ক পথে বাস, ব্যক্তিগত যানবাহন, এবং রেলপথ । সড়ক পথে রাজধানী ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জের দূরত্ব ১৪৩ কি.মি । ঢাকা থেকে সড়কপথে বাসে মহিষলুপি পয’ন্ত যেতে হবে । রাজশাহীগামী এনপি এলিগেন্স কিংবা ন্যাশনাল পরিবহনে উঠে মহিষলুপিতে নামুন । মহিষলুপি থেকে পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে তাড়াশ উপজেলা । ভ্যানগাড়িতে চারজন যাত্রী ওঠানো হয় । জনপ্রতি ভাড়া নেয় দশ টাকা । আর ঢাকা থেকে বাসে মহিষলুপি পর্যন্ত ভাড়া নেয়া হয় তিনশত পঞ্চাশ থেকে চারশত টাকা । অপরদিকে নাটোর শহর থেকে সিংড়ার বাস ভাড়া বিশ থেকে পঁচিশ টাকা এবং সিংড়া থেকে পুর্বদিকে বারুহাস নৌকায় অথবা ভ্যানে যেতে মাত্র দশ হতে বিশ টাকা এবং উত্তরে চৌগ্রাম থেকে মাত্র ১৫ থেকে পঁচিশ টাকা খরচ হবে ।
যেখানে খাবনঃ
খাওয়া দাওয়ার জন্য তাড়াশে মোটমুটি মানের হোটেল হচ্ছে শুভ হোটেল । রুই মাছ কিংবা কাতল মাছ দিয়ে একবেলা খেতে খরচ পড়বে সত্তুর থেকে আশি টাকা । এতে পাবেন দুই প্লেট ভাত, এক বাটি ডাল ও এক টুকরা মাছ, সঙ্গে থাকবে যে কোনো একটা তরকারি আর রুচিকর ভত্তা । অপরদিকে সিংড়া বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি হোটেল । সেখানেও পাবেন স্বল্প দামে নদী ও বিলের টাটকা মাছের তরকারী আর সরু চালের সাদা ভাত । খাওয়া শেষে সিরাজগজ্ঞের বিখ্যাত ধানশিঁড়ির দই দিয়ে মিষ্টিমুখ করতে ভুলবেন না ।
প্রধান প্রধান নদ-নদী সমূহঃ যমুনা, বড়াল, ইছামতি, করতোয়া, হুরাসাগর, গোহালা, বাঙ্গালী, গুমনী, এবং ফুলঝুড়ি নদী ।

 

সুত্র: See Bangladesh (বাংলাদেশকে দেখো).