সংবাদ শিরোনাম
DSE

অভাবের সংসারের সোনার মেয়ে মারিয়া

maria

বীরেন্দ্র মারাক মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। বাবার স্মৃতি কিছু মনে আছে মারিয়া মান্দার। তবে ঠিক কতদিন আগে বাবাকে হারিয়েছেন, সেটা মনে করতে পারলেন না অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক। ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রামের বীরেন্দ্র মারাক মারা যাওয়ার পর তিন মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে সংসারের হাল ধরেন তার স্ত্রী এনোতা মান্দা।

ছেলে-মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতে অন্যের বাড়িতে কৃষি কাজ করতে হচ্ছে মারিয়ার মাকে। এমনকি মারিয়ার মেজো বোন পাপিয়া মান্দাকেও বেছে নিতে হয়েছে মায়ের পথ। স্বামীহারা এনোতা মান্দা অনেক কষ্টে বিয়ে দিয়েছেন তার বড় মেয়ে হাসি মান্দাকে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে ঘাম ঝরানো অর্থ দিয়ে কোনোমতে ছোট ছেলে দানিয়েল মান্দাকে লেখাপড়া করাচ্ছেন এনোতা। ছোট মেয়ে মারিয়া গত বছর এসএসসি পাশ করে আর এগুতে পারেননি। সেই মারিয়াই এখন অভাবের সংসারের ‘সোনার মেয়ে’।
দু’দিন আগেও দেশের কয়টা মানুষ চিনতেন এ মারিয়াকে? না চেনারই তো কথা; কিন্তু রোববার ভারতকে হারিয়ে যখন সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি হাতে তুলে নিয়েছেন তখন মিডিয়ার কল্যাণে পুরোদেশে ছড়িয়ে গেছে মারিয়ার মুখ। ছোট-বড় প্রায় সবার মুখেই এখন মারিয়ার নাম। তিনি যে কিশোরী ফুটবলারদের অধিনায়ক! দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ভারতের মেয়েদের মাঠের যুদ্ধে হারিয়ে যে শ্রেষ্ঠত্ব পেলো বাংলাদেশ তার নেতৃত্বে ছিলেন মারিয়া।
খ্রিষ্টান পরিবারের মেয়ে। ধর্মীয়ভাবে তাদের সবচেয়ে উৎসবের দিন ২৫ ডিসেম্বর। ফুটবল খেলতে গিয়ে এ নিয়ে টানা দুটি বড় দিন পরিবারের সঙ্গে উদযাপন করা হয়নি মারিয়ার। রোববার রাত পর্যন্ত মোবাইল সেট ছিল টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে। সোমবার সকালে সেটা হাতে পেয়েই প্রথমে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন মারিয়া।

‘মা খেলাটা দেখতে পারেনি। তবে খবরের মধ্যে আমাদের জয়ের আনন্দ দেখেছেন। মাকে বলেছি রাতের মধ্যে ফিরবো, তোমার সঙ্গে রাতের খাবার খাবো। মা বলেছেন, আমি ভালো খেলেছি। সাবধানে এসো’-সোমবার সন্ধ্যায় ঘরের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়ার আগে জাগো নিউজকে বলছিলেন কিশোরী ফুটবলারদের অধিনায়ক।

পুরো দলের ১৫ দিনের ছুটি মঙ্গলবার থেকে। তবে খ্রিষ্টান ধর্মাবম্বলী মারিয়া ও সিনিয়র দলের আরেকজন শিউলি আজিমকে রোববার রাতের মধ্যেই তাদের বাসায় ফেরানোর ব্যবস্থা করেছে বাফুফে। মারিয়া ও শিউলির বাড়ী কলসিন্দুরে, অল্প দূরত্বে। এ দু’জন একসঙ্গেই ফিরছেন ঘরে। পরপর দুই বছর ‘বড় দিন’ কাটিয়েছেন মা, ভাই-বোন ছাড়া। রোববার রাতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে খাবেন- এটা বলতেই আনন্দে চিকচিক করছিল মারিয়ার চোখ, ‘প্রথমে আমি সবাইকে বড় দিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। মাকে বলেছি, এসে রাতে একসঙ্গে খাবো। জানি কয়টা পৌঁছতে পারবো। যত রাতেই পৌঁছাই, আমার মা জেগে থাকবেন।’
অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা মারিয়া তার পরিবারের সবার মুখে হাসি দেখতে চান। দেশকে ট্রফি উপহার দেয়ার পর হাসি ফুটেছে তার মুখে, হাসিয়েছেন লক্ষ-কোটি মানুষকে। সে হাসির মধ্যে ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে গেছে তার অভাবের কথাগুলো, ‘আমি যে এখন অনেক সুখী, অনেক খুশি।’

বাড়ীতে মা আর ভাই-বোনদের কী কোনো সহযোগিতা করতে পারেন ফুটবল খেলে? ‘মধ্যে বাফুফে আমাদের এক বছর প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছিল। তখন আমি মাকে টাকা দিতাম। এখন আবার দিতে পারছি না’-বলছিলেন মারিয়া মান্দা।

গরীবের ঘর থেকে কিভাবে ফুটবলার হলেন আজকের মারিয়া মান্দা? সে গল্পটা শোনা যাক তার কাছ থেকেই। ‘২০১১ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গোল্ডকাপ ফুটবলে প্রথম খেলি। একদিন মফিজ স্যার (কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক) সবাইকে ডেকে বললেন, তোমরা কে কে ফুটবল খেলতে চাও? অনেকের সঙ্গে আমিও নাম দিলাম। প্রথম দুই বছর ঢাকা বিভাগীয় পর্যায় চ্যাম্পিয়ন হয় আমাদের স্কুল। ট্রফি জিতি প্রথম ২০১৩ সালে। ২০১৪ জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৪ দলে সুযোগ পাই। নেপালে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ রিজিওনাল চ্যাম্পিয়নশিপ আমার প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। ফুটবল শুরু করেছিলাম ডিফেন্ডার হিসেবে, এখন খেলছি মিডফিল্ডে। এই প্রথম অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করলাম। এটা আমার কাছে অনেক গর্বের’-নিজের ক্যারিয়ারটা সংক্ষেপে তুলে ধরলেন মারিয়া মান্দা।

অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেই শিরোপা। তো এ দায়িত্বটা কেমন উপভোগ করছেন কিশোরীদের মাঠের নেতা? ‘সবদিক বিবেচনা করেই একটি দলের অধিনায়ক মনোনীত করা হয়। তার উপর আস্থাও রাখেন কর্মকর্তারা। আমি দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। আমি অধিনায়ক হলেও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে অবদান সবার। আমাকে দলের সবাই মানে। আমিও যে কোনো বিষয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করি। ক্যাম্পে ও মাঠে সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে রাখার চেষ্টা করি। কোনো সমস্যা হলে কোচ, ম্যাডামের (বাফুফের মহিলা উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ) সঙ্গে আলোচনা করি’-নেতৃত্বের গুরু দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা এভাবেই জানালেন মারিয়া।