বঙ্গবন্ধু প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন

মোঃ ইউছুফ হোসেন, সম্পাদক বিডিফিন্যান্সিয়াল নিউজ২৪.কম লিমিটেড

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে শোক ও কলঙ্কিত দিন ১৫ আগস্ট। এদিন সপরিবারে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্য যারা নিজেদের বিবেক বন্ধক রেখেছিল বিদেশি প্রভুদের কাছে, তাদের হাতে প্রাণ হারান বাঙালি জাতির জনক। স্বাধীনতার মহানায়কের শাহাদাতবরণের দিন যেমন শোকের তেমন শোককে শক্তিতে পরিণত করারও।

১৫ আগস্টের ঘটনা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল। জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদারদের ভাড়াটে চরেরা প্রকারান্তরে বাঙালি জাতির আত্মাকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের শত্রুরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে প্রকারান্তরে এ দেশের স্বাধীনতাকেই হত্যা করতে চেয়েছিল।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা পরিবর্তনের যে কালো অধ্যায়ের সূচনা হয় তার পরিণতিতে জাতীয় রাজনীতিতে বারবার বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িকতা ও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিভেদ নীতিকে কবর দিয়েছিল। তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস চলে ১৫ আগস্টের পর থেকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। ১৯৯৬ সালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হয় দেশবাসীর প্রত্যাশার পরিপূরক হিসেবে। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং খুনিদের ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক খুনিদের বিদেশ থেকে আইনি পথে দেশে এনে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাঙালি জাতির হৃদয় থেকে তাঁর আদর্শ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলেছিল। খুনিদের সে অপচেষ্টা সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু নেই কিন্তু তাঁর অপরাজেয় আদর্শ টিকে আছে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।

কেন কুচক্রীরা সেদিন বঙ্গবন্ধুকেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেছিল? এটি নিছক ব্যক্তিবিশেষের হত্যাকাণ্ড ছিল না; ছিল জাতির অস্তিত্বের ওপর আঘাত। এর মাধ্যমে যে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই নীতি ও আদর্শকেই ঘাতকেরা হত্যা করতে চেয়েছিল।

১৫ আগস্টের কুচক্রীরা বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে না পারলেও তারা রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে ক্ষত তৈরি করেছিল, তার রেশ এখনো রয়ে গেছে। ১৫ আগস্টের পর ঘাতকেরা জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর চার সহযোগী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও এম মনসুর আলীকে হত্যা করে। ক্ষমতা জবরদখলকারী খন্দকার মোশতাক আহমদ ইনডেমনিটি জারি করে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান সেই অধ্যাদেশকেই পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনে পরিণত করেন, যা বাতিল করতে জাতিকে ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

নানা বাধাবিপত্তি কাটিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের উদ্যোগ নিলেও এক মেয়াদে তা শেষ করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ সম্পন্ন এবং পাঁচ ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। এটি যেমন স্বস্তিদায়ক, তেমনি বিদেশে পলাতক খুনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে না পারা দুর্ভাগ্যজনক।

খুনিরা ১৫ আগস্টের কালো রাতে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মাধ্যমে তার স্বপ্নকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলো এবং দেশকে ব্যর্থ রাষ্টে পরিণত করতে চেয়েছিলো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নিরলস কাজ করছেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে এবং মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষের মুখে হাসি দেখতে চেয়েছিলো। খুনিরা বঙ্গবন্ধুর সবস্মৃতি মুছে ফেলতে চেয়েছিলো। কিন্তু তারা সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একজন নেতা, যাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের সম্পর্ক গভীর। ঘাতকের বুলেট তাঁকে হত্যা করলেও সে সম্পর্ক মোটেই ছিন্ন করতে পারেনি। যত দিন যাচ্ছে, ততই ইতিহাসে তাঁর নাম সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

বঙ্গবন্ধু নেই। কিন্তু তার আদর্শ আছে, তার স্বপ্ন-প্রত্যাশা আছে, আছে তার প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। তার আদর্শ তার জীবন ও কর্মের মধ্যেই বিধৃত হয়ে আছে। তার স্বপ্নের কথা, প্রত্যাশার কথাও কারো অজানা নেই। কী ধরনের দেশ ও সমাজ তিনি কামনা করতেন, তার আত্মজীবনী পড়লে তা সম্যক উপলব্ধি করা যায়। তিনি স্বাধীন দেশ এবং শান্তি প্রত্যাশা করতেন। এ প্রত্যাশা পূরণের জন্যই তিনি জীবনব্যাপী রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তিনিই আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। তিনি দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করার কাজ শুরু করেছিলেন, যা শেষ করে যেতে পারেননি। ঘাতকচক্র সে সুযোগ তাকে দেয়নি। সোনার বাংলা গড়তে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ছিল জাতীয় ঐক্য ও সংহতি। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি নির্মাণে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন-প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করতে হলে একনিষ্ঠভাবে সেই আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। দৃঢ়তার সঙ্গে সেই স্বপ্ন-প্রত্যাশা হৃদয়ে লালন করতে হবে এবং কর্মের মাধ্যমে তার বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। পরিশেষে, আমরা আজকের এই দিনে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্য যারা সেদিন শহীদ হয়েছিলেন, তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।