মিয়ানমার থেকে ছোট ছোট মাছ ধরার নৌকায় আসে ইয়াবার চালান

বিডিএফএন টোয়েন্টিফোর.কম

অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ক্রেজি মেডিসিন বা পাগলা ওষুধ হিসাবে পরিচিত ভয়ংকর মাদক ইয়াবা। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকেও অপরিচিত ছিল এই মাদক। কিন্তু এখন সেবন তালিকার এক নম্বরে। শহরের গলি থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম সর্বত্র এর বিস্তৃতি। এই মাদক সীমান্ত এলাকা দিয়ে ঝড়ের গতিতে দেশে প্রবেশ করছে।

গত এক যুগে উদ্ধারের পরিমাণ দেখলেই দেশজুড়ে ইয়াবার ভয়াবহ বিস্তারের ধারণা পাওয়া যায়। এ সময়ে উদ্ধার হয় প্রায় আট হাজার কোটি টাকার ইয়াবা। এটা দেশে ছড়িয়ে যাওয়া ইয়াবার দশ ভাগের এক ভাগ। আর দেশে বছরে অন্তত ৬০ হাজার কোটি টাকার ইয়াবা বেচাকেনা হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তে যথাযথ মনিটরিং ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর যথাযথ ভূমিকার অভাবে মাদকটি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিচারে প্রত্যাশিত সাফল্য না থাকাও এর জন্য দায়ী। জীবনঘাতী এই মাদকের প্রভাবে একটি প্রজন্মের চিন্তার জগতে বন্ধ্যত্ব তৈরি হয়েছে। শরীরে দেখা দিয়েছে নানা ত্রুটি। এখন এই প্রজন্মকে রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত এক যুগে (২০০৯-২০) ইয়াবার লাগামহীন বিস্তারের চিত্র পাওয়া যায় মাদক উদ্ধারকারী পাঁচটি সংস্থা থেকে। সংস্থাগুলো হলো-মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। তাদের হিসাব বলছে, গত ১২ বছরে উদ্ধার হয় ২২ কোটি ৩০ লাখ ৭৪ হাজার ১৯১ পিস ইয়াবা। সর্বোচ্চ উদ্ধার হয় ২০১৮ সালে ৫ কোটি ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৮টি এবং সর্বনিু উদ্ধার হয় ২০০৯ সালে ১ লাখ ৩২ হাজার ২৮৭ পিস।

নমুনা রেখে উদ্ধার হওয়া ইয়াবা ট্যাবলেটগুলো আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ধ্বংস করা হয়। ঢাকায় গড়ে প্রতি পিস ইয়াবা বিক্রি হয় ৩০০-৪০০ টাকা। তবে স্থানভেদে এর মূল্য পরিবর্তন হয়। প্রতি পিস ইয়াবা ৩৫০ টাকা ধরলে এক যুগে উদ্ধারকৃত ইয়াবার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৮০৭ কোটি ৫৯ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ টাকা।

দক্ষিণ এশিয়ায় মাদকের বিস্তার নিয়ে কাজ করছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম ইমদাদুল হক। বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার নিয়ে তিনি যুগান্তরকে বলেন, এক সময়ের বহুল প্রচলিত মাদক ফেনসিডিলের জায়গা এখন ইয়াবার দখলে। দিন যতই যাচ্ছে এর বিস্তার বাড়ছেই। উদ্ধারের পরিমাণ দেখলেই এর বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সাধারণত মাদক যা ধরা পড়ে প্রকৃত চালান তার দশগুণ বেশি হয়ে থাকে।

অর্থাৎ মোট মাদকের ৯০ শতাংশই থেকে যায় দৃষ্টির আড়ালে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমার থেকে ইয়াবার মূল চালান আসছিল। তবে সম্প্রতি সীমান্ত এলাকাগুলোতে কড়াকড়ির জন্য ড্রাগ ডিলাররা বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে। এখন ভারত হয়ে ইয়াবা আসছে। মিয়ানমার সীমান্তে যেমন এই মাদকের কারখানা ছিল, ভারত সীমান্ত ঘিরেও এখন তেমন হচ্ছে।

দেশে এ পর্যন্ত ২৫ ধরনের মাদক উদ্ধার হয়েছে। বেশি উদ্ধার হয়েছে ইয়াবা ট্যাবলেট, হেরোইন, কোকেন, আফিম, গাঁজা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ, বিয়ার ও ইনজেকটিং ড্রাগ-এই নয়টি মাদক। গত ১২ বছরে এই নয়টি মাদক যে পরিমাণে উদ্ধার হয়েছে-তার প্রচলিত দাম আনুমানিক ১৪ হাজার ৩১৩ কোটি ৭৯ লাখ ৬২ হাজার ১৩০ টাকা।

আর উদ্ধারকৃত মোট মাদকের বেশির ভাগই ইয়াবা। ধারাবাহিকভাবে এর বিস্তার বাড়ছে। উদ্ধারের চিত্র দেখলে যা সহজেই অনুমান করা যায়। ২০০৯ সালে ইয়াবা উদ্ধার হয় ১ লাখ ৩২ হাজার ২৮৭ পিস। নয় বছর পর ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ৪০ হাজার ১০১ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ কোটি ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৮ পিস হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে ইয়াবা উদ্ধার কোটি পিস ছাড়ানো শুরু হয়। ওই বছর ২ কোটির বেশি পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়।

ইয়াবার বিস্তার নিয়ে কথা হয় মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের উপদেষ্টা সদস্য অধ্যাপক ড. অরুপ রতন চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, সহজে বহন, গ্রহণ ও দ্রুত অ্যাকশনের ফলে ইয়াবার ব্যবহার বেড়েছে। এটা এতটাই সহজলভ্য হয়েছে যে, ঘরে-ঘরে, অলি-গলিতে ও মুদি দোকানেও পাওয়া যায়। আগে একটা সময় ঢাকা ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এর ব্যবহার বেশি ছিল। কিন্তু এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বছরে অন্তত ৬০ হাজার কোটি টাকার ইয়াবা ট্যাবলেট বেচাকেনা হচ্ছে। যেগুলো উদ্ধার হচ্ছে তা খুবই সামান্য। বেশির ভাগই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, ইয়াবা উদ্ধারের সূচক ঊর্ধ্বমুখী। গত বছর (১২ মাসে) সাড়ে তিন কোটি ৬৩ লাখ ৮১ হাজার ১৭ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়। আর এ বছর ১০ মাসে উদ্ধারকৃত ইয়াবার পরিমাণ গত বছরের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। নানামুখী উদ্যোগ নিয়েও ইয়াবার বিস্তার প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। দেশে মাদক আনার ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে সীমান্তবর্তী এলাকা।

সমুদ্র, নদী ও পাহাড় এলাকা দিয়ে ঢুকছে ইয়াবা। অনেক সময় আসছে আকাশপথেও। বহনকারীদের অনেকে ধরা পড়লেও ছাড়া পেয়ে ফের ইয়াবা ব্যবসায় জড়াচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে সেবন ও বেচাকেনা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। আর রুট হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকা।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিচালক (অপারেশনস) কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার অন্যতম কারণ হলো এর চাহিদা। এগুলো ঢুকছে সীমান্ত হয়ে। কারণ সীমান্তের অনেক এলাকা এখনো সুরক্ষিত নয় (ভালনারেবল)। মোট ইয়াবার ৮০-৮৫ ভাগ আসছে মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে। বাকিটা ভারত সীমান্ত ও অন্যান্য মাধ্যম হয়ে। গত বছরের থেকে এ বছর উদ্ধার অনেক বাড়বে। সরবরাহ বাড়ায় উদ্ধার বেড়েছে অথবা উদ্ধারকারী সংস্থার তৎপরতায় এই সংখ্যা বেড়েছে-দুটোই হতে পারে।’

পাঁচ সংস্থার মাদক উদ্ধারের ঘটনায় এক যুগে ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮২টি মামলা হয়। যার বেশির ভাগই ইয়াবা সেবন, উদ্ধার ও বিক্রির ঘটনায় দায়ের করা। সর্বোচ্চ মামলা হয় ২০১৯ সালে ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৮টি এবং সর্বনিু হয় ২০০৯ সালে ২৭ হাজার ৪৪১টি। মোট মামলায় আসামি করা হয় ১০ লাখ ১০ হাজার ৭১৮ জনকে। ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৪৭ জন আসামি হয় এবং ২০০৯ সালে সর্বনিু ৩৪ হাজার ৩১৫ জন আসামি হয়।

২০১৭ সাল থেকে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় মামলা ১ লাখ ছাড়ানো শুরু হয়েছে। এরপর আর তা লাখের নিচে নামেনি। একইভাবে এসব মামলায় আসামির তালিকাও ২০১৭ সাল থেকে এক লাখের ওপরে গেছে। তালিকা ক্রমেই বড় হচ্ছে।

দুই দশকে (২০০১-২০২০ সাল) হওয়া মাদক মামলাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নানা কারণে আসামিদের বড় একটি অংশ খালাস পেয়ে গেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এই সময়ে দায়ের করা মামলার মধ্যে ৪৬ হাজার ৯০৭টি নিষ্পত্তি। এসব মামলায় আসামি ছিল ৫০ হাজার ৫৯৯ জন।

মোট নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে ২৩ হাজার ৫৩৫ মামলায় সব আসামি খালাস পেয়েছে। খালাস পাওয়া আসামির সংখ্যা ২৬ হাজার ১৩৮। অর্থাৎ অর্ধেক মামলার আসামি খালাস পেয়েছে। মাদক উদ্ধারকারী সংস্থা ডিএনসি বলছে, এসব আসামির অধিকাংশই ইয়াবা কারবারে জড়িত। এদের গ্রেফতারের পর পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের অভাব ও তদন্তে আন্তরিকতার ঘাটতির ফলে তারা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আবু যুগান্তরকে বলেন, নানা ত্রুটির কারণে মাদক মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাক্ষীদের অনেকেই আদালতে এসে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়। পুলিশ বা উদ্ধারকারী সংস্থা জোর করে সাক্ষ্য নিয়েছে এমন অভিযোগ আনে। অনেক সময় সাক্ষী আসে না। এজন্য সাক্ষী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে। মাদক উদ্ধারের পরিমাণ সঠিক দিতে হবে। বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে রাখা হলে তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত থাকতে হবে। অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় ভুল-ভ্রান্তি এড়াতে পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) মতামত নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায় ডিএনসির পরিচালক (অপারেশনস) কুসুম দেওয়ানের কাছ থেকে। তিনি বলেন, আমরা তো হাতেনাতে আসামি ধরি। সেজন্য আমাদের করা মামলাগুলো সাজার হার তো ন্যূনতম ৮০ শতাংশ হওয়ার কথা। কিন্তু সেটি না হয়ে হচ্ছে ৪০-৪৫ শতাংশ। এটা আরও বাড়া উচিত। সাক্ষ্য প্রদানে দুর্বলতা ও মামলার তদন্তে কিছু সমস্যার কারণে আসামিরা মুক্ত হয়ে যায়। সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেয় না। অনেকে আবার বহু বছর পর যখন সাক্ষ্য দিতে যায় তখন অনেক কিছু মনে থাকে না। সেটা কখনো কখনো ১০-১২ বছর পরও হয়। পাবলিক সাক্ষীদের ক্ষেত্রে আসামিদের সঙ্গে অনেক সময় বোঝাপড়া হয়ে যায়। আর বিভাগীয় সাক্ষীরা অবসরজনিত কারণে অনেক সময় আর আদালতে যান না।