করের আওতা বাড়লে হার কমানো সম্ভব : ডিসিসিআইয়ের ওয়েবিনারে সালমান এফ রহমান

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান এমপি বলেছেন, আমাদের জিডিপিতে করের অবদান খুবই কম এবং যত বেশি করের আওতা বাড়ানো যাবে, ততই করের হার কমানো সম্ভব হবে এবং এটি আমাদের ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রায় ৫৫ হাজার নতুন করদাতাকে করের আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছে।

গতকাল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা: ব্যবসা পরিচালন সূচকে অন্যতম অনুষঙ্গ’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এ কথা বলেন তিনি। ওই ওয়েবিনারে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদান করেন।

সালমান ফজলুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সব বন্দরের সক্ষমতা বেড়েছে, তবে এক্ষেত্রে আরো উন্নয়নের জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্র্রসারণে সরকার বেশকিছু প্রয়োজনীয় সংস্কারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে এবং আগামীতে তা অব্যাহত থাকবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিডার ওএসএস সেবা পুরোদমে চালু হলে ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা আরো সহজতর হবে।

উপদেষ্টা আরো বলেন, সরকার গৃহীত বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প যেমন বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কক্সবাজার দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগসহ পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন হলে আমাদের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে। সামনের দিনগুলোতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মোকাবেলার জন্য সরকার মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে আরো বেশি হারে গুরুত্বারোপসহ বিশেষ বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

মামলা পরিচালনার দীর্ঘসূত্রতা নিরসনকল্পে ‘মামলার সময় ব্যবস্থাপনা’ উন্নয়নের প্রতি জোর দিয়ে তিনি বলেন, সরকার অনেক সময় বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সত্ত্বেও ব্যাংক, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে তা যথাসময়ে না পৌঁছানোর জন্য জরিপের সময় কম পয়েন্ট পেতে হয়। এতে সংস্কার করেও তেমন লাভ হয় না। তিনি এজন্য যেকোনো সংস্কারের সংবাদ দ্রুততম সময়ে ব্যবসায়ী মহলসহ সব স্তরে যেন সবাই প্রচার করে তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ওয়েবিনারের স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, বাংলাদেশে বাণিজ্যবিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিতে সাধারণ প্রায় চার বছর সময় লেগে যায়, তবে পৃথিবীর অনেক দেশ বাণিজ্যবিষয়ক আইনি প্রক্রিয়ার এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা হ্রাসকরণে সংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ প্রয়োগ, কোর্ট কার্যক্রমের অটোমেশন, ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেমের প্রবর্তন, বিশেষায়িত বাণিজ্যিক কোর্ট চালুকরণ এবং এডিআর কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর অধিক হারে জোরারোপ করছে।

তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সূচক’-এ বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৫ এবং প্রতিবেদনে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোরারোপ করা হয়। প্রতিযোগিতার সক্ষমতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি এবং বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে আরো অধিক হারে এডিআর ব্যবহারকে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রতিযোগী সক্ষমতায় উন্নতি প্রবৃদ্ধি, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সচিব মো. গোলাম সারওয়ার বলেন, ব্যবসা পরিচালনার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নয়নে সরকার এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেছে। আরবিট্রেশন, ব্যবসায়িক চুক্তি বাস্তবায়ন এবং দেউলিয়াত্ব প্রভৃতি বিষয়ে দেশের বেসরকারি খাতকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার সহায়তা প্রদান করা হবে। বাণিজ্য বিরোধবিষয়ক মামলা পরিচালনায় ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যার আওতায় ই-ফাইলিং, প্রমাণাদি সংরক্ষণে ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হবে, ফলে এ ধরনের বিরোধ দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।

ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, সাত্তার অ্যান্ড কোং-এর প্রধান মো. সামির সাত্তার। তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোর বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তির সময়সীমা কমানোর লক্ষ্যে ‘সিভিল প্রসিডিউর কোড (সিপিসি)’-এর সংস্কার একান্ত জরুরি, সেই সঙ্গে মামলার ক্ষেত্রে ই-ফাইলিং প্রক্রিয়া ও কোর্ট ফি প্রদানের ক্ষেত্রে ই-পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রবর্তন, ইলেকট্রনিক কেস ম্যানেজমেন্ট প্রভৃতি চালু করা যেতে পারে। ব্যবসা পরিচালন সূচকে দেউলিয়ার বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সে লক্ষ্যে একটি রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক গঠনের প্রস্তাব করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে বাণিজ্য বিরোধ ইস্যুগুলোর সমাধানের গতি আনায়নের আরবিট্রেশন, মিডিয়েশন এবং লিটিগেশন প্রভৃতি বিষয়ের ওপর আরো অধিক হারে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনভেস্টমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক জগন্নাথ চন্দ্র ঘোষ, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) পরিচালক জীবন কৃষ্ণ সাহা রয়, জেট্রো বাংলাদেশের প্রতিনিধি কাজিমুরি ইয়ামাডা, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সিইও আহসান খান চৌধুরী এবং ওরিক্স বায়ো-টেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড বাও ওয়েবিনারে আলোচক ছিলেন।

তারা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে বেশকিছু সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে বিদেশী কোম্পানিগুলোর মুনাফা নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার অনুমোদন, বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্টরিংয়ের কার্যক্রম চালুকরণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। আলোচকরা ভ্যাট ব্যবস্থাপনা, বন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, বন্ড প্রবর্তন প্রভৃতি বিষয়ের ওপর জোরারোপ করেন। পাশাপাশি বাণিজ্যবিষয়ক আইনগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার, স্থলবন্দরগুলোতে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক পরিষেবা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।

মুক্ত আলোচনায় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয় খুবই জরুরি, সেই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার সূচকের উন্নয়নে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করতে হবে।

ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি এনকেএ মবিন এফসিএস, এফসিএ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ঢাকা চেম্বারের সহসভাপতি মনোয়ার হোসেনসহ ঢাকা চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা এ ওয়েবিনারে যোগদান করেন।