চলতি অর্থবছরে ৫ বিলিয়ন ছাড়াল ডলার ক্রয়
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার ক্রয় করে। এছাড়া ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ২০ কোটি ৯০ লাখ, ৫ ফেব্রুয়ারি ১৬ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৯ কোটি ৬৫ লাখ, ৪ ফেব্রুয়ারি ১৬ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৭ কোটি ১০ লাখ এবং ২ ফেব্রুয়ারি ১৬ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ২১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। সব মিলিয়ে চলতি ফেব্রুয়ারিতে এখন পর্যন্ত কেনা হয়েছে ১৪৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এছাড়া চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছর মোট ৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন বা ৫৩৮ কোটি ১৫ লাখ ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দাবি করেন, বাজার থেকে এ ডলার কেনার মাধ্যমে দেশের রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এতে বাজারে টাকার সরবরাহও বেড়েছে। যদিও ডলার কিনে বাজারে টাকা সরবরাহ করায় মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
মূলত ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দেশে বৈধ পথে আসা প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রবাহ বাড়তে থাকে। এর ফলে ব্যাংকগুলোয় ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা দেয়। এতে দেশের বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার দর অস্থিতিশীল হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। একই সময়ে ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার দর স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ তথ্য জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসীরা দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। ২০২২-২৪-এর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ৪৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকা আরো শক্তিশালী হয়েছে। এর ফলে ডলারের দর পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে বাজার স্বাভাবিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনছে।’ এক্ষেত্রে আগের মতোই বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ (এফএক্স) নিলাম কমিটির মাধ্যমে মাল্টিপল প্রাইস অকশন পদ্ধতিতে এ ডলার কেনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ব্যাংক খাত থেকে ডলার ক্রয় করার মাধ্যমে দেশের রিজার্ভও স্থিতিশীল হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশের বর্তমান গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একই দিন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তথা বিপিএম৬ হিসাবে রিজার্ভের স্থিতি ছিল ৩০ দশমিক শূন্য ৬ ডলার।
২০২১ সালের আগস্টে দেশের গ্রস রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। এর আগে ২০২০ সালে কভিড-১৯ মহামারীর কারণে আমদানি কার্যত থমকে গেলেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে থাকে। এতে ব্যাংক খাতে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যায়। সে সময় দেশের বাজারে বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাজার থেকে ডলার কিনতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও দ্রুত স্ফীত হয়।
পরবর্তী সময়ে রিজার্ভের সে ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানির ফলে রিজার্ভ চাপে পড়ে যায়। একই সময়ে অস্বাভাবিক হারে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ায় রিজার্ভ ক্ষয়ের গতি বৃদ্ধি পায় এবং টাকার অবমূল্যায়ন ঘটতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। এর ফলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গ্রস রিজার্ভ কমে ২৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর অর্থ পাচার কমতে শুরু করে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। এতে দেশের বাজারে ডলারের প্রবাহ বাড়তে শুরু করে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে বিক্রি নয়, বরং বাজার থেকে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বাজার স্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি রিজার্ভেও স্থিরতা দেখা যাচ্ছে।


