পরিবর্তন আসছে ২২ ব্যাংকে
দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের পুনর্গঠনের আভাস মিলছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি মিলিয়ে ২২টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছেন, শিগগিরই এসব ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে নতুনভাবে গঠন করা হতে পারে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর।
দায়িত্ব নিয়েই তিনি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপ নেন। এর অংশ হিসেবে ছয় মাসের মধ্যে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কিছু ব্যাংককে একীভূত (মার্জার) করার উদ্যোগও নেওয়া হয়। যার মধ্যে একাধিক ইসলামি ধারার ব্যাংককে একীভূত করে একটি ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের এসব পদক্ষেপ শুরু থেকেই নানান বিতর্কের জন্ম দেয়। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, নতুন পর্ষদে নিয়োগ পাওয়া কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। ফলে ব্যাংকিং খাতে কাঙ্ক্ষিত সুশাসন কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের বিষয়টি আবারও সামনে আসে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পর্ষদকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানান, ইতোমধ্যে ২২ ব্যাংকের বর্তমান পর্ষদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে সম্পূর্ণ নতুন পর্ষদ গঠন করা হবে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কমপ্লায়েন্স ও করপোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বল সেসব ব্যাংকে দক্ষ ও পেশাদার ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। শুধু আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলে ব্যাংক খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান হবে না, বরং ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এদিকে বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে তফসিলভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৬১টি। এত বড় খাতে কার্যকর নজরদারি ও সুশাসন নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এমন ব্যক্তিদের থাকতে হবে, যারা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক কমপ্লায়েন্স এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ড সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘সামাজিক ও অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে মতবিনিময় হলেও এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি।’ তবে সূত্রগুলো বলছেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা এগিয়ে চলছে এবং শিগগিরই দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত ব্যাংক পর্ষদ পুনর্গঠন দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে এ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দক্ষতাভিত্তিক হবে সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


