শিরোনাম

South east bank ad

ব্যাংক খাতের ক্ষত কমাতে ৫-১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে —ড. আহসান এইচ মনসুর

 প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ পূর্বাহ্ন   |   মন্ত্রনালয়

ব্যাংক খাতের ক্ষত কমাতে ৫-১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে —ড. আহসান এইচ মনসুর

অনেক ধরনের সমস্যা থাকার পরও আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কিছু উন্নতি হয়েছে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা খাতে। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখা। সেটা আমরা মোটামুটি সফলতার সঙ্গে অর্জন করতে পেরেছি। কারণ মূল্যস্ফীতি কমাতে চাইলে প্রথমে আমাদের বিনিময় হার স্থিতিশীল করা দরকার।

আগে বিদেশী ব্যাংকগুলো আমাদের ক্রেডিট লিমিট কমিয়ে দিচ্ছিল, এমনকি বন্ধও করে দিচ্ছিল। এখন তারা সব লিমিট পুনরায় খুলে দিয়েছে। আমাদের ব্যাংকগুলোর রিইন্স্যুরেন্সসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে এখন আর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি ক্রেডিট পাচ্ছে তারা।

আমাদের প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের যে বৈদেশিক পাওনা জমে ছিল, সেগুলো সব পরিশোধ করা হয়েছে। ‘টাকা দিচ্ছেন না কেন?’—এমন অভিযোগ আর নেই।

আমাদের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট এখন সারপ্লাস আছে। গত বছর আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টেও সামান্য সারপ্লাস ছিল। সে হিসেবে মনে করি আমাদের এক্সটারনাল সেক্টর এখন স্থিতিশীল; কোনো দুর্বলতা নেই। আমদানির ক্ষেত্রে যা ইচ্ছা আমদানি করা যাবে। কেউ যদি বলেন যে তিনি আমদানি করতে পারছেন না, সেটা তার নিজস্ব সমস্যা; ডলারের কোনো অভাব নেই। ইচ্ছামতো ডলার কেনা যাবে।

আমাদের কোনো বাধ্যতামূলক মার্জিন নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক সব মার্জিন তুলে নিয়েছে এবং ব্যাংক-ক্লায়েন্ট সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যবসা করার সুযোগ দিয়েছে। এদিক থেকে আমরা স্বস্তিতে আছি।

আমি যেদিন গভর্নর হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম, সেদিন ডলারের দাম ছিল ১২০ টাকা; এখন ১২২ টাকা। যদিও একই সময়ে ভারতে ডলারের দাম ৮৪ থেকে ৮৯তে উন্নীত হয়েছে। তবে অতিরিক্ত স্থিতিশীলতাও ভালো নয়। তাই আমরা ডলারের দর বাজারভিত্তিক করে দিয়েছি। ডলারের দাম নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো হস্তক্ষেপ করছে না। সরবরাহ-চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই ডলারের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে।

গত বছরের রমজান মাসটা একটু কঠিন ছিল। তখন আমরা পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে সরবরাহ ঠিক রেখেছিলাম। এ বছরের রমজান সামনে রেখেও এখন পর্যন্ত কোনো ঝুঁকির ইঙ্গিত দেখছি না। রমজানের প্রয়োজনীয় সব পণ্যের এলসি এরই মধ্যে খোলা হয়েছে। অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে এলসি খোলার হার গত বছরের তুলনায় ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। ফলে আমদানি বাড়লেও ডলারের ওপর চাপ পড়ছে না।

তবুও বলতে হবে আমাদের অনেক সমস্যা আছে এবং এগুলো রাতারাতি সমাধান হবে না। কিছু সমস্যা এখনো শনাক্ত করে যাচ্ছি। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ একটি বড় সমস্যা। নতুন নীতি ও প্রতি প্রান্তিকে হালনাগাদ তথ্য আসার কারণে আমরা এনপিএলের (খেলাপি ঋণ) প্রকৃত পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। গত সরকার যখন এনপিএল ৮ শতাংশ বলেছিল, আমি অনুমান করেছিলাম আসল এনপিএল তার তিন গুণ অর্থাৎ ২৫ শতাংশ হবে। বাস্তবে সেটা এখন ৩৫ শতাংশ। এটা কোনো ছোট সমস্যা নয়। এক-তৃতীয়াংশের বেশি ঋণ অকার্যকর হলে বাকি দুই-তৃতীয়াংশের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক চালানো অনেক বড় চাপ। ব্যাংক খাতের এ ক্ষত কমাতে কমপক্ষে ৫-১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে সুদের হার কিছুটা বেশি। কিন্তু আমাদের প্রেক্ষাপটও দেখতে হবে। আমাদের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ শতাংশ ছিল। সে তুলনায় নীতি সুদহার ১০ শতাংশ বেশি নয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই মূল্যস্ফীতি ও নীতি সুদহারের ব্যবধান দুই-আড়াই শতাংশ দেখা যায়। সে তুলনায় আমাদের সুদহারের পার্থক্য খুব বেশি নয়। চলতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে দেশের চালের দাম বৃদ্ধি হয়েছিল ১৮ শতাংশ। সেজন্য মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। তা না হলে মূল্যস্ফীতি আরো আগেই সাতের ঘরে নামতে পারত; কিছু নীতিগত ব্যর্থতার কারণে হয়নি। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে চালের দাম ১৮ শতাংশ বেড়েছিল, যার ফলে মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি হয়েছে। বিশ্বের কোথাও চালের দাম বাড়েনি, ভারতে তো বাড়েনি। আমরা আমদানি বন্ধ রেখেছিলাম। এতে চাপ তৈরি হয়েছে। পরে হয়তো খুলেছি, কিন্তু সেই সময় অনেক দেরি হয়ে গেছে।

আমাদের আমানত প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশে নেমে গিয়েছিল, এখন তা ১০ শতাংশ। সামনে আরো বাড়বে। তবে সরকারের ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে। ৬ শতাংশ আমানত থেকে ১ লাখ কোটি টাকা যদি সরকারই নিয়ে যায়, তাহলে বেসরকারি খাত কী করবে? ব্যাংকের ওপর সরকারের ঋণ চাহিদা কমানো না গেলে মানি মার্কেটের ওপর চাপ কমবে না।

অনেকে বলেন আমদানি কমে গেছে; কিন্তু সত্যিকারে ভলিউম কমেনি। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত বছর ভলিউমে রেকর্ড আমদানি এসেছে। এবারো জুলাই-অক্টোবর পর্যন্ত ভলিউম প্রবৃদ্ধি দুই অংকে গেছে। কিন্তু আমদানি বিল কমেছে। এর কারণ হলো অর্থ পাচার কমেছে। আগে যেসব ওভার ইনভয়েসিং হতো, তা কমে গেছে। সেজন্য শুধু পরিসংখ্যান দেখে ভুল সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না।

আমাদের আরেকটি মূল সমস্যা হলো কাঠামোগত দুর্বলতা। আমাদের বন্ড মার্কেট নেই বললেই চলে, স্টক মার্কেট দুর্বল, ইন্স্যুরেন্স খাত করুণ অবস্থায়। সবাই ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক সব চাপ ব্যাংকের ওপর পড়ে। এটা অসহনীয়। আমাদের অবশ্যই বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে হবে। নীতিমালা তৈরি হয়েছে। আর্থিক বিভাগের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। শিগগিরই বাস্তবায়ন কার্যক্রম এগোবে।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাদের এক্সপোজার অনেক বেশি, তাদের বলব আপনারা আর ব্যাংকের দিকে তাকাবেন না। বাজার থেকে বন্ড তুলুন। ব্যাংক ১৫-২০ বছরের ঋণের জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নয়। আমরা আপনাদের উৎসাহিত করব বন্ডে যেতে। আমাদের স্টক মার্কেটকেও পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। আস্থাহীনতা দূর করতে হবে। এখানে নতুন স্ক্যান্ডাল হলে অর্থনীতির ক্ষতি হবে।

ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ১৪টি ব্যাংকের বোর্ড পরিবর্তন করেছি। ফলও পাচ্ছি। ইসলামী ব্যাংকের দুরাবস্থা ছিল; এখন তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ব্যাংক খাত ধ্বংস হয়ে যায়নি; বরং দুটি অংশে ভাগ হয়েছে। ভালোভাবে পরিচালিত ব্যাংক আর খারাপভাবে পরিচালিত ব্যাংক। যেখানে সমস্যা আছে, সেখানে আমাদের হস্তক্ষেপ করতেই হবে। এজন্য অনেক আইন তৈরি করছি। কিছু অধ্যাদেশ আকারে প্রকাশিত, কিছু পাইপলাইনে। রাজনীতিবিদদের কাছে অনুরোধ, এ আইনগুলো সংসদে পাস করে স্থায়িত্ব দেবেন।

ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করছি—বোর্ডে অন্তত ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক, মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছর (৩ বছর করে), পরিবারভিত্তিক মালিকানা ১০ শতাংশের বেশি নয় (বিদেশী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ব্যতিক্রম) ইত্যাদি নীতি সংশোধন করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে মালিক নয়, তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করতে হবে।

আমাদের ব্যাংক খাতের দুরবস্থার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজনৈতিকীকরণ দায়ী। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিরাজনৈতিকীকরণ করতে হবে। পৃথিবীর কোনো দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেতন কাঠামো সরকারের সঙ্গে মেলে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পেশাদারত্ব বজায় রাখতে হলে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

আমানত সুরক্ষা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানও (এনবিএফআই) এর আওতায় আসছে। খারাপ সম্পদ মূল্যায়নের জন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি তৈরি হচ্ছে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা থেকে বাঁচতে অর্থঋণ আদালতকে কার্যকর করার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। সম্মানজনক এক্সিটের জন্য ব্যাংকরাপ্সি আইন আনা হচ্ছে। ব্যবসা বন্ধ হলে মারামারি-ধরাধরি নয়; বাজার থেকে বের হওয়ার জন্য বৈধ পদ্ধতি থাকা দরকার।

আমাদের খারাপ ও অচল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে কিছু করার দরকার ছিল। সেজন্য ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রয়োগ করে পাঁচ দুর্বল ব্যাংককে নিয়ে আমরা একটি শক্তিশালী নতুন ব্যাংক গঠন করছি। আশা করি, আগামী সপ্তাহেই এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। এখানে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকবে। এটিই দেশের সবচেয়ে বড় পুঁজিভিত্তিক ব্যাংক হবে। সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে।

আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছি। নিয়মকানুনে পরিবর্তন এনে গ্যারান্টি ব্যবস্থাকে আরো উদার করার চেষ্টা করছি। এর লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো যেন গ্যারান্টি স্কিম ব্যবহার করতে উৎসাহিত হয়, সাহস পায় এবং এসএমই খাতে আরো জোরালোভাবে এগোতে পারে। প্রয়োজন হলে ব্যাংকগুলো এনজিওদের সঙ্গেও কাজ করে কৃষিঋণ বা এসএমই ঋণ বিতরণ করতে পারবে। এটাকেও আমরা বিবেচনা করছি। কৃষি ও এসএমই খাতকে ব্যাপকভাবে সহায়তা দেয়াই আমাদের লক্ষ্য। এনআরবিরা (অনাবাসী বাংলাদেশী) বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছেন। শুধু রেমিট্যান্স নয়, বিনিয়োগের মাধ্যমেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তারা।

রাজনৈতিক নেতৃত্বদের বক্তব্যে একটি আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট, তারা বাংলাদেশকে খুব শিগগিরই এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে চায়। এখন আমরা প্রায় অর্ধ-ট্রিলিয়নের কাছে। সেখান থেকে পূর্ণ ট্রিলিয়নে পৌঁছার লক্ষ্য অবশ্যই আমরা সমর্থন করি। কিন্তু এটাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিতে জোর দিতে হবে।

অর্থনৈতিক ন্যায্যতা নিয়েও কথা হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও ন্যায্যতা—দুটোই দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে একটি চালিকাশক্তি হিসেবে নিয়েছি। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। বাকি ৩৪ শতাংশকেও যুক্ত করতে হবে। আগামী পাঁচ-দশ বছরের মধ্যে প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সিস্টেমের অংশ হবে বলে আশা করি।

দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে বিদেশে নিয়ে গেছে যারা, তাদের বিষয়ে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। পরবর্তী সরকারকেও বিষয়টি এগিয়ে নিতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক আপস করলে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভুল উদাহরণ তৈরি হবে। নাগরিক হিসেবে আমাদের দাবি—যারা দেশের সম্পদ লুট করেছে, তাদের কাউকে ছাড় দেয়া যাবে না।

BBS cable ad

মন্ত্রনালয় এর আরও খবর: