আশরাফের ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম প্রকল্প আবিস্কারের নানা গল্প

মোঃ জামাল হোসেন, (যশোর):
আমার জীবনের গল্পটা শুরু হয় সেই জন্মের আগে থেকে। আম্মু বলতেন তুই পেটে থাকতে দুজনই মারা যাচ্ছিলাম। আমি গর্ভে থাকাকালীন সময়ে অনেক বড় একটা আঘাত পেয়েছিলেন আম্মু। চিকিৎসা সেবায় ও আল্লাহর রহমতে আমরা দুজনই বেঁচে যাই এবং জন্মের দিনেই আমি পুরস্কার অর্জন করি।
ওই সময় আমি যে হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করি সেই হাসপাতালে বাচ্চাদের শরীর স্বাস্থ্য ভালো হলে, এক কথায় মোটাতাজা ও ওজনের দিক থেকে এগিয়ে থাকলে তাদের পুরস্কৃত করা হতো। আমার শরীর স্বাস্থ্য ও ওজন ঠিক থাকাতে আমি পুরস্কারটি পাই। এভাবেই নিজের জীবনের গল্পটা বলতে শুরু করেন মোহম্মাদ আশরাফুজ্জামান আশরাফ।
বাংলাদেশে প্রথম রান্না করা রোবট ‘সুরুচি কুকিং রোবটে’র আন্ড্রোয়েড ও ওয়েব ডেভলোপার হিসেবে কাজ করেছেন আশরাফ। পরবর্তীতে সেই রোবটটি উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এই বিজ্ঞানীর জন্ম ১৯৯৮ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল জেলা যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার যাদবপুরে। মা সায়রা জামান ও বাবা মৃত আসাদুজ্জামানের সাত ছেলে-মেয়ের মধ্যে আশরাফ পঞ্চম।
আশরাফ শার্শা পাইলট হাইস্কুল থেকে জেনারেল ইলেকট্রনিক্স (ভোকেশনাল) এ জিপিএ ফাইভ পেয়ে এসএসসি পাশ করেন। এরপর তিনি যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ২০১৯ সালে ডিপ্লোমা শেষ করেন। খুব ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতি নিয়ে পড়ে থাকতে ও ঘাটাঘাটি করতে ভালোবাসতেন আশরাফ।
যখন আশরাফ ৮ম শ্রেণিতে পড়েন, তখনই মোটামুটি ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল এর প্রিন্সিপাল মোটামুটি শেখা হয় তার। আশরাফের স্বপ্ন ছিলো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার। কিন্তু ২০০১ সালে তার বাবা মারা যাওয়াতে তাদের এতো বড় সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয়। তাই অর্থাভাবে সাইন্স নিয়ে পড়া হয়নি তার। গ্রামের পাশেই শার্শা ভোকেশনাল পাইলট হাইস্কুলে ধার দেনা করে ১৬৫০ টাকা দিয়ে জেনারেল ইলেকট্রনিক্স বিভাগে তার মা তাকে ভর্তি করে দেন।
আশরাফ বলেন, আমি সবসময় বিল গেটস এর একটা উক্তিতে বিশ্বাসী ছিলাম তা হলো ‘তোমার মন যা চায়, তুমি তাই করো’। তাই আমার মন যখন যা চেয়েছে, তাই করেছি। কিন্তু সমাজ আমাকে এত ছোট করল যে, ভোকেশনালে ভর্তি হয়ে যেনো মহা অন্যায় করেছি।
অনেকেই বলত ভোকেশনালে ভর্তি হয়ে সাইকেলের মিস্ত্রি ছাড়া আর কিছু হতে পারবেনা। তবে আমার মা আমাকে সাহস যোগাতেন। বলতেন, যে কোনো শিক্ষা কোনোদিন ছোট হতে পারে না। এই কথাটাই আমার অনুপ্রেরণা যোগায়। ওই কথাটা মনে গেঁথে গেল তার। শুরু হলো নতুন চ্যালেঞ্জ।
ক্লাস নাইন থেকেই আশরাফ এডভান্স লেভেলের সার্কিট অটোমেশন ডিভাইস বানাতে শুরু করেন। এসএসসি শেষ হওয়ার পর সবাই ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং শুরু করেন। তবে টাকার অভাবে ঠিকভাবে ক্লাসে যেতে পারতেন না। বাসায় থেকেই ভর্তি পরীক্ষার জন্য পড়ালেখা চালিয়ে যেতেন।
ভাগ্যক্রমে ২০১৫ সালে বিটিইবি বোর্ড ঘোষণা করেন যে এবার ভর্তি পরীক্ষা হবে না। এর পরিবর্তে এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট কোটার মাধ্যমে অটোমেটিক যাচাই-বাছাই করে ভর্তি হওয়া যাবে। ভাগ্যের খেলে আশরাফ নিজের স্বপ্নের সাবজেক্টে ইলেকট্রিকাল ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হোন।
এরপর শুরু হয় আশরাফের নতুন যাত্রা। কলেজের ক্লাস শুরু হওয়ার পর সবাই যখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত তখন তার দিন কাটে যন্ত্রপাতির সঙ্গে। হঠাৎ একদিন আশরাফ কলেজের নোটিশ বোর্ডে দেখেন স্কিল কম্পিটিশন নামে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে কানাডা স্টেপ প্রকল্প। তখনই তিনি চিন্তা করেন যে, তিনি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবেন এবং তা স্যারদেরকে বলেন। স্যারেরা আশরাফের কথা শুনে অবাক হোন ভাবেন, ১ম সেমিস্টারের ছাত্র কম্পিটিশন করবে? পারবে তো ? এসব ভাবতে থাকে।
তিনিই একমাত্র প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র যিনি কম্পিটিশনে নাম লিখিয়েছে। আশরাফের শুরু হলো বিচিত্র এক গবেষণার নেশা। ১ম সেমিস্টারে তার প্রথম প্রজেক্ট ছিল অটোমেটিক ডোর লক এন্ড সিকিউরিটি সিস্টেম। সেই প্রজেক্ট তিনি সম্পন্ন করলেও কোনো মার্ক পাননি। প্রতি বছর অন্তর একটা করে কম্পিটিশন হয়। পরবর্তী বছরের জন্য প্রস্তুুতি নেয় আশরাফ। পরবর্তী বছরের প্রজেক্ট ছিল অটোমেটিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। এটাও আশরাফ সফলভাবে সম্পন্ন করেন এবং প্রথম স্থান অর্জন করেন।
এরপর ২০১৭ সালে কম্পিটিশনের জন্য তার প্রজেক্ট, ইনস্টিটিউট লেভেলে প্রথম স্থান, আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রথম স্থান ও জাতীয় পর্যায়ে ৭ম হোন। পরবর্তীতে কানাডা থেকে বিচারকবৃন্দ আসেন প্রজেক্ট দেখতে, এরপর এই প্রকল্প নিয়ে শুরু হয় তার নতুন আশা। এরপর ডিপ্লোমা চতুর্থ বছর মাল্টিপারপাস এগ্রিকালচার ফ্যাসিলিটিস প্রকল্পটি তৈরি করে ইনস্টিটিউট লেভেলে প্রথম স্থান, আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রথম স্থান ও জাতীয় পর্যায়ে সেরা দশের মধ্যে ৭ম স্থান অর্জন করেন আশরাফ। ২০১৮ সালে 'আবিষ্কারের খোঁজে' অনুষ্ঠানে আশরাফের প্রকল্পটি সেরা দশে জায়গা করে নেয়।
এরপর ২০১৮ সালের চতুর্থ জাতীয় উন্নয়ন মেলায় বাংলাদেশ কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হয়ে আশরাফ নতুন প্রকল্প নিয়ে কম্পিটিশন করেন তা হলো ‘বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম’। এ প্রকল্পটি জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন এবং জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ তৃতীয় হয় ও বিশেষ পুরস্কার পায়। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০১৯ এ আশরাফের প্রকল্পটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বচক্ষে দেখেন।
এছাড়াও ২০১৮ সালে আইডিইবি আইসিটি ইনোভেশন এক্সপো এবং গণভবনে জাতীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন আশরাফ। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি থেকে তাদের প্রকল্পটি ‘বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম’ অনুমোদন প্রাপ্ত হয়। তখনই শুরু হয় বাণিজ্যিকভাবে প্রকল্পটির প্রসার। ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার-২০২১ এ নির্বাচিত হয় আশরাফের প্রকল্প ‘বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম’। তার এই উদ্ভাবন বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করবে।
আশরাফ ২০২০ সালে যশোর রিসার্চ ল্যাব নামে বিজ্ঞান ক্লাব সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার প্রাপ্ত সাইবার টিনস অ্যাপ এ হেড অফ ডেভেলপার হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৯ সালে তিনি ছয় মাসের জন্য আইসিটি ডিভিশনের অ্যান্ড্রয়েড ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং করেন।
করোনাকালীন সময়ে যশোর জেলায় ভলেন্টিয়ার হিসেবে আশরাফ জেলা প্রশাসককে অনলাইন পশুর হাট সফটওয়ারটি তৈরি করে দেন। আশরাফ তার প্রকল্পের কাজ ও বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করার জন্য ‘সাইক্লোন’ নামে একটি টিম গঠন করেন। সাইক্লোন টিমের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন আশরাফ। এরইমধ্যে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এরমধ্যে অন্যতম হলো চলো জিপিএস ট্র্যাকার, চলো ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, চলো শপ, চলো আইটি, চলো আইটি ট্রেনিং সেন্টার ইত্যাদি।
তিনি বেনাপোল রহমান চেম্বারের ২য় তলায় চলো আইটির ট্রেনিং সেন্টারের উদ্বোধন করেছেন। বর্তমানে এ্যাপস বা সফটওয়্যার সম্পর্কে কোন প্রশিক্ষণ নিতে গেলে সন্তানদের ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরে পাঠাতে হয়, সেটা এখন দোড় গোরায় নিয়ে এসেছেন। এছাড়াও যারা বিভিন্ন আইটি সমস্যার সমাধানের জন্য বাইরে যেতেন সেটা রাতদিন ২৪ ঘন্টা এখানেই সমাধান করা হবে।
আশরাফ বলেন, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম প্রকল্পটির মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করার জন্য বাংলাদেশের সকল যানবাহনে আমাদের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চাই। এ প্রকল্পের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য ডিজিটালি ও টেকনোলজির মাধ্যমে কাজ করতে চাই এবং আরও নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে চাই।