দেশে রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে সুগন্ধি চালের বাজারদর
দেশে চলতি বছর ঢালাওভাবে সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি দেয়া হয়েছে।
দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে রফতানির অনুমতি দেয়া হয়। এ খবরে বিগত কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে সুগন্ধি চালের বাজারদর। এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসায়ীদের ওপর।
ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক মাস আগেও পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) সবচেয়ে বেশি বিক্রীত সুগন্ধি চাল চিনিগুঁড়ার (ভালো মানের) সর্বনিম্ন দাম ছিল ৫ হাজার ৫০০ টাকা। এক মাস আগেও একই মানের চিনিগুঁড়া চালের দাম ছিল ৭ হাজার ৫০০ টাকা। এরই মধ্যে দাম বেড়ে ৯ হাজার ৪০০ টাকায় উঠে গেছে। অর্থাৎ এক মাসে চিনিগুঁড়া চালের দাম বেড়েছে ১ হাজার ৯০০ টাকা, দুই মাসে দাম বেড়েছে ৩ হাজার ৯০০ টাকা। দুই মাসে দেশের পাইকারি বাজারে চিনিগুঁড়া চালের কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৭৮ টাকা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও রফতানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রফতানির অনুমতি দেয়ার দুই মাস হলেও চূড়ান্ত অনুমতি নেয়ার প্রবণতা খুবই কম। সর্বশেষ ২৩ জুলাই পর্যন্ত সুগন্ধি চাল রফতানির জন্য ৭৯টি প্রতিষ্ঠান অনুমতি নিয়েছে। এর মধ্যে ১৩ মের অনুমোদন থেকে ৭৩টি প্রতিষ্ঠান এবং ১৪ জুলাইয়ের অনুমোদন থেকে ছয়টি প্রতিষ্ঠান অনুমতি নিয়েছে। অনুমোদন পাওয়ার পরও রফতানিতে ধীরগতির ফলে বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত রফতানি হবে না বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দুই মাস আগেও দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের মধ্যে চিনিগুঁড়ার খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ১১০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে। বর্তমানে দাম বেড়ে সর্বনিম্ন ১৭০ থেকে ২০০ টাকায় উঠে গেছে। এর মধ্যে মোড়কজাত ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলোর চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিপ্রতি ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। চাহিদাসম্পন্ন চিনিগুঁড়া চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাজারে বিভিন্ন জাতের চাল মিশ্রিত করে ভেজাল চিনিগুঁড়া চালের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের একটি শ্রেণী আতপ কাটারিসহ বিভিন্ন সরু চাল চিনিগুঁড়ার সঙ্গে মিশিয়ে কম দামে বিক্রির মাধ্যমে ভোক্তাদের ঠকাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামের চাক্তাই চাল মিল মালিক সমিতির সভাপতি মো. রফিক উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রফতানির অনুমতি দেয়ার পর থেকেই দেশের সব ব্র্যান্ডের চিনিগুঁড়া চালের দাম বেড়ে যায়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই লাভের আশায় রফতানির অনুমতি নিলেও রফতানির কোনো কার্যক্রমই চালাচ্ছে না। কেউ কেউ চালের দাম কমে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আবার কেউ কেউ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সংগ্রহ করতে না পারায় রফতানি না করে বসে আছে। যার কারণে মজুদ চাল বাজারে বিক্রি না হওয়ায় সরবরাহ সংকটে বাজারে দাম বাড়ছে।’ একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রফতানি প্রক্রিয়া শেষ করা না হলে দেশের সুগন্ধি চালের বাজার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সব ধরনের চালের দাম অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
জানা গেছে, এবার সুগন্ধি চাল রফতানির ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। রফতানিযোগ্য চালের অনুমোদন হস্তান্তর না করা, রফতানীকৃত চালের নির্ধারিত দাম থাকায় কেউ কেউ অনুমোদন পেলেও চূড়ান্ত অনুমতি নিচ্ছে না। আবার দুই মাসের ব্যবধানে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়ায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। কয়েক বছর ধরে দেশে খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় সুগন্ধি চালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় রফতানির কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মো. ইলিয়াস ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক মাসের ব্যবধানে চিনিগুঁড়া চালের দাম বস্তাপ্রতি ৪ হাজার ৫০০ টাকা বেড়ে গেছে। কিন্তু ব্যবসায়িক মন্দায় চাইলেও ভাত কিংবা পোলাও-বিরিয়ানির দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে লাভের হার অস্বাভাবিক কমে ব্যবসায় বড় ধরনের সংকটের মধ্যে রয়েছেন সাধারণ হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকরা।’
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে সরকার দুই দফায় মোট ২৩ হাজার ৯৫৯ টন সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি দিয়েছিল। প্রথম দফায় ১৮ হাজার ১৫০ টন এবং দ্বিতীয় দফায় ৫ হাজার ৮০০ টন অনুমতি দেয়া হয়। রফতানির সময়সীমা কয়েক দফায় বাড়িয়ে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিল সরকার। কিন্তু পুরনো বছরের রফতানির সময়সীমা শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই নতুন করে আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ চাল রফতানির অনুমোদন দেয়ায় দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সুগন্ধি চাল রফতানি করে আয় হয়েছিল ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে আয় কমে হয় ২০ লাখ ৬০ হাজার ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ আয় আরো কমে ১০ লাখ ৭০ হাজার ডলারে নেমে আসে। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকার সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি স্থগিত রেখেছিল। এবার প্রতি কেজি চাল রফতানির সর্বনিম্ন মূল্য ১ দশমিক ৬০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।


