জমি নিবন্ধনে ব্যয় কমানোর দাবি আবাসন খাতের উদ্যোক্তাদের
জমির নিবন্ধন ব্যয় কমানোর দাবি তুলেছেন দেশের আবাসন ও প্রপার্টি খাতের উদ্যোক্তারা।
নিবন্ধনকালে আরোপিত করের হার যৌক্তিক হলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে বলেও মনে করছেন তারা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রতিনিধিদের বক্তব্যে এমন কথা উঠে আসে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে গতকাল আবাসন ও নির্মাণ, সিমেন্ট, ভূমি উন্নয়ন, চামড়া, চা, প্লাস্টিক ও পাদুকাসহ মোট ১২টি সংগঠনকে নিয়ে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
আলোচনায় রিহ্যাবের পক্ষ থেকে জমি নিবন্ধন ব্যয় কমাতে গেইন ট্যাক্স ৩-৬ শতাংশের পরিবর্তে ৩ শতাংশে স্থির রাখার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি স্ট্যাম্প শুল্ক দেড় শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার ফি ২-৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ এবং জমির আয়তনভিত্তিক (বর্গফুট) স্ল্যাবের পরিবর্তে সব ক্ষেত্রে ২ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়।
এছাড়া সংগঠনটি ফ্ল্যাট মূল্যের ওপর আরোপিত আউটপুট বা বিক্রয় ভ্যাট কমানোর প্রস্তাবও দিয়েছে। রিহ্যাব সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘ভবন নির্মাণ ও জমি উন্নয়ন দুই ক্ষেত্রেই আমাদের মূসক পরিশোধ করতে হয়।’
নিবন্ধন ব্যয় কমানোর প্রস্তাব সম্পর্কে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘জমির নিবন্ধন খরচ বিক্রেতার দেয়ার কথা। কিন্তু এখানে তা চাপানো হয় ক্রেতার ওপর।’
বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলডিএ) পক্ষ থেকেও ভূমি উন্নয়ন খাতে জমি বা প্লট নিবন্ধনে গেইন ট্যাক্স, স্ট্যাম্প ফি, নিবন্ধন ফি, স্থানীয় সরকার কর ও ভ্যাট বাবদ মোট ব্যয় সাড়ে ১১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ হারে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরজমিনে পরিদর্শনের ভিত্তিতে মৌজা মূল্য নির্ধারণের দাবি জানানো হয়।
বিএলডিএর সচিব একেএম নওশেরুল আলম বলেন, ‘প্রতি শতাংশ জমিতে আমাদের উৎসে কর পরিশোধ করতে হয় দেড় লাখ টাকা। এটি তুলে দিয়ে দলিল মূল্যের ওপর ৩ শতাংশ হারে নির্ধারণ করা যায়।’
আলোচনায় চামড়া ও পাদুকা শিল্পের রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রফতানিমুখী ট্যানারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাঁচামাল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল-মেশিনারিজ আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে কর ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
বিএফএলএলএফইএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আশরাফ উদ্দীন খান স্বাক্ষরিত প্রস্তাবে বলা হয়, ‘চামড়া খাতের শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোয় ৪৩ ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। রফতানি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এসব রাসায়নিক আমদানিতে সব ধরনের উৎসে কর ও মূসক প্রত্যাহার করা আবশ্যক।’ এ সময় বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও রাসায়নিক দ্রব্য আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব দেয়া হয়।
টাইলস ও স্যানিটারি পণ্য উৎপাদন পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ)। এছাড়া কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে অপচয় বিবেচনায় নিয়েও শুল্কায়নের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানি পর্যায়ে আরোপিত ৫ শতাংশের অতিরিক্ত শুল্ক-কর এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আরোপিত এসডি বা আরডি প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দিয়েছে বিসিএমইএ।
দেশেই মূল্য সংযোজিত ব্র্যান্ডগুলোর মান উন্নয়নে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান পূরণে প্রয়োজন অনুযায়ী চা আমদানির অনুমতি দেয়া জরুরি বলে জানিয়েছে টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিটিএবি)। সংগঠনটির ভাষ্যমতে, চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে উৎপাদন না বাড়লে এবং মানসম্মত চায়ের সরবরাহ না থাকলে স্থানীয় নিলামে পণ্যটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। দেশে আমদানি নিষিদ্ধ না হলেও পণ্যটি আনতে চা বোর্ডের অনীহা-দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়া প্রয়োজন। দেশের চায়ের সরবরাহ পর্যাপ্ত হলে শুধু উচ্চমানসম্পন্ন ভ্যালু অ্যাডেড ব্র্যান্ডগুলোর জন্য স্বল্প মাত্রায় ছাড়া অতিরিক্ত আমদানির প্রয়োজন হবে না।
টিটিএবির পক্ষ থেকে আসন্ন বাজেট নিয়ে দেয়া প্রস্তাবে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে প্রত্যাহার করে নেয়া সত্ত্বেও এখনো ট্যারিফ ভ্যালু বিবেচনায় নিয়েই শুল্কায়ন করা হচ্ছে। এতে ল্যান্ডেড কস্ট বেড়ে যাওয়ায় আমদানীকৃত চায়ের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে দেশী পণ্যের দেড় গুণে দাঁড়াচ্ছে। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক অপরিবর্তিত রেখে প্রত্যাহার করে নেয়া ট্যারিফ ভ্যালুকে বিবেচনায় নিয়ে পণ্যটির শুল্কায়ন নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে টাইলসকে বিলাসবহুল পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার দাবি জানানো হয়। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘এখন ১৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়, এটা উঠিয়ে দিলে মূসক ফাঁকি কমে আসবে।’
আলোচনা সভায় স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণকে সামনে রেখে নীতি সহায়তার দাবি তুলেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ।


