ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, চাপে রাজস্ব আহরণ
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হওয়ায় সামগ্রিক ভোগব্যয় কমেছে। এর প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবির ভাব দেখা দিয়েছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
চলতি মূলধন সংকটে উদ্যোক্তারা ব্যবসা পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির আয় ও মুনাফা কমে গেছে। একই সঙ্গে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে সরকারের রাজস্ব আহরণেও। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে সরকারের রাজস্ব আয় গত বছরের শেষ প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তুলনায় কমেছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী দিনগুলোতে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের ৬৫ শতাংশের বেশি আসে পরোক্ষ কর থেকে। পরোক্ষ করের জোগানের ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। উৎপাদকদের পণ্য বিক্রি ও ভোক্তার ভোগ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবে পরোক্ষ কর বাবদ সরকারের রাজস্ব আহরণ কমে যায়।
সরকারের রাজস্ব আহরণসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আমদানি শুল্ক বাবদ ৭ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ হয়েছে, যা গত বছরের শেষ প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কম। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ভ্যাট খাতে ৩৬ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যা গত বছরের শেষ প্রান্তিকের চেয়ে দশমিক ৩৪ শতাংশ কম। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমদানির বিপরীতে ভ্যাট বাবদ ১৩ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যা গত বছরের শেষ প্রান্তিকের চেয়ে ৪ শতাংশ কম। অবশ্য ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির বিপরীতে ভ্যাট বাবদ ২২ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যা গত বছরের শেষ প্রান্তিকের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে পরোক্ষ কর, বিশেষ করে আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)। সাম্প্রতিক সময়ে এ দুই খাতেই রাজস্ব আহরণে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে আমদানি শুল্ক আয় আগের প্রান্তিকের তুলনায় কমে যাওয়া এবং ভ্যাট আহরণেও প্রবৃদ্ধি না থাকা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতা বিরাজ করছে। আমদানি কমে যাওয়া, শিল্পোৎপাদনে ধীরগতি এবং ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি রাজস্ব খাতে পড়ছে। বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য যে মন্দা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা রাজস্ব আহরণে ধীরগতির অন্যতম কারণ।’
ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে না উল্লেখ করে ড. সেলিম রায়হান আরো বলেন, ‘সরকারকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, কর ব্যবস্থাকে আরো সহজ ও স্বচ্ছ করা, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদন ও বাণিজ্য খাতকে সহায়তা দেয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হলে স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব আহরণ বাড়বে।’
দেশের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের নেতারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ের ব্যয়েও। ফলে উৎপাদন, বিক্রি, বিনিয়োগসহ সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব আহরণের গতি কমে যাওয়াকে তারা অস্বাভাবিক মনে করছেন না। তারা মনে করছেন, বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর দিকে সরকারের মনোযোগ দেয়া উচিত।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে উচ্চ সুদহার—সবকিছু মিলিয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সবাই খুব কষ্টে আছে। এখন ১৩-১৫ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালানো খুবই কঠিন। ব্যবসা ঠিকমতো চালাতে না পারলে কর দেব কীভাবে? সরকার সবসময় বলে, ১ কোটি ২০ লাখ টিআইএনধারী আছে, কিন্তু রিটার্ন জমা দেয় ৪০-৪৫ লাখ। তাই শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ালে হবে না, বরং করজাল বাড়াতে হবে। না হলে রাজস্ব বাড়ানো কঠিন হবে।’
পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, পরোক্ষ কর ছাড়াও সার্বিকভাবে সরকারের রাজস্ব আহরণ আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সব মিলিয়ে ১ লাখ ১০ হাজার ৪২২ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে, যা গত বছরের শেষ প্রান্তিকের তুলনায় ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। তবে গত বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আয় কমেছে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আয় হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার রাজস্ব, যা গত বছরের শেষ প্রান্তিকের চেয়ে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি। যদিও এ সময়ে এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব আয় গত বছরের প্রথম প্রান্তিক ও শেষ প্রান্তিকের চেয়ে কমে গেছে।
এনবিআরের মাধ্যমে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল সরকার। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শুল্ক ও কর আহরণে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়কালে সংস্থাটি মোট ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আহরণ করতে পেরেছে। এ সময় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী নয় মাসে মোট রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকায়।
কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আয় না হওয়ায় ব্যয় নির্বাহে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, এ বছরের মার্চে সরকার ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৩৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এক মাসের ব্যবধানে যা গত এপ্রিলে ৩৯ শতাংশ বেড়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আগে ইস্যু করা ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। ফলে এপ্রিলে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের নেয়া নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ব্যাংক খাত থেকে ট্রেজারি-বিল বন্ডের মাধ্যমে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।


