বৈশ্বিক পণ্যবাজারে অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।
গত সপ্তাহে স্বর্ণ ও রুপার মতো মূল্যবান ধাতু থেকে শুরু করে জ্বালানি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দামে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ঝুঁকি জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং উচ্চ সুদহারের কারণে স্বর্ণের দাম নিম্নমুখী হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন বিনিয়োগকারীরা। খবর আনাদোলু এজেন্সি।
পণ্যবাজারে এ অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অমীমাংসিত উত্তেজনাকে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি জাহাজ চলাচল ও পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি সরবরাহ ব্যবস্থা আরো বিঘ্নিত হয়, তবে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আবারো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার যাও আশা দেখা গিয়েছিল, কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো বেশ অনিশ্চিত।
বিনিয়োগকারীদের এখন মূল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডের আসন্ন বৈঠক। ধারণা করা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমান সুদহার ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যেই রাখবে। তবে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সুদহার কমানোর পরিকল্পনা আপাতত পিছিয়ে যেতে পারে। সাধারণত সুদহার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের মতো আপৎকালীন সম্পদে বিনিয়োগ কমিয়ে দেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ধাতব পণ্যের বাজারে।
গত সপ্তাহটি মূল্যবান ধাতুর বাজারের জন্য বেশ নেতিবাচক ছিল। মার্কিন ডলারের বিনিময় হার শক্তিশালী হওয়া এবং ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা বাড়ায় স্বর্ণের দাম কমেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যান্য ধাতুর মধ্যে রুপার দাম কমেছে ৬ দশমিক ৫ এবং প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দাম কমেছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ করে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব এখনো ফুরিয়ে যায়নি। অন্যদিকে বিশ্বের বড় বাজার চীনে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় তামার দামও কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে।
বিপরীতে জ্বালানি খাতের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত সপ্তাহে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম প্রতি ব্যারেলে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার কোনো সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনা না থাকায় এবং জাহাজ চলাচলে ঝুঁকির কারণে জ্বালানি তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে লজিস্টিক ও পরিবহন খাতে। ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
কৃষিপণ্যের বাজারেও বর্তমানে অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সার, পরিবহন ও বীমা খরচ বাড়ায় কৃষিপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। গত সপ্তাহে গমের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৮ শতাংশ। মার্কিন কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, প্রতিকূল আবহাওয়ায় শীতকালীন গমের মাত্র ৩০ শতাংশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া ভুট্টার দাম ১ দশমিক ৩ এবং চিনি ও কফির দাম যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে চাল ও সয়াবিনের দাম সামান্য কমেছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্ব পণ্যবাজার এখন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা। এ দুইয়ের চাপে সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য পণ্যগুলোর দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। যদি দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধান না হয় এবং বড় দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এ অস্থিরতা আরো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।


