নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের মিশন শুরু
তিন বছরের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ।
এ লক্ষ্যে ইভো ক্রুজনারের নেতৃত্বে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল গতকাল ঢাকায় তাদের মিশন শুরু করেছে। আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে আসার পর নতুন কর্মসূচি নিয়ে এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক মিশন। এদিকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের মানুষের স্বার্থ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে আইএমএফের কোনো কর্মসূচিতে সরকার অংশ নেবে না।
মিশনের প্রথম দিনে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জানাজায় অংশ নেয়ার কারণে সেটি স্থগিত করা হয়। বৈঠকটি আজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জনস্বার্থ ও দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে। আগের সরকারের সময়ে নেয়া আইএমএফ কর্মসূচিতে এমন কিছু শর্ত ছিল, যা একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য ছিল না। এ কারণেই বর্তমান সরকার সেই কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের প্রধান লক্ষ্য শুধু অর্থায়ন নিশ্চিত করা নয়; বরং এমন একটি কর্মসূচিতে যাওয়া, যেখানে দেশের অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থ পুরোপুরি সংরক্ষিত থাকবে।’
আইএমএফ প্রতিনিধি দল প্রথম দিনে গতকাল অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ অর্থ বিভাগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এবারের মিশনের মূল উদ্দেশ্য নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাবনা, কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা। আগামী কয়েক দিনে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে আইএমএফ প্রতিনিধি দল।
আলোচনায় বাজেট বাস্তবায়ন, রাজস্ব আহরণ, সরকারি ঋণ পরিস্থিতি, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, খেলাপি ঋণ, ব্যাংক রেজল্যুশন এবং আর্থিক খাতের অন্যান্য কাঠামোগত সংস্কার গুরুত্ব পাবে। সরকারের পক্ষে কোন কোন সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব এবং আইএমএফের প্রত্যাশা কী—এসব বিষয় নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হবে। মিশন শেষে প্রতিনিধি দল আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদের কাছে একটি প্রতিবেদন দেবে। এরপর আগামী অক্টোবরের বার্ষিক সভার আগে বা পরে আরেকটি মিশন বাংলাদেশ সফর করতে পারে। সেই মিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন ঋণ কর্মসূচি আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইএমএফ প্রতিনিধি দল সফরের প্রথম দিনে গভর্নরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট টিমগুলোর সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংক রেজল্যুশনসহ আর্থিক খাতের সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফ বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে। পরে অতিরিক্ত অর্থায়ন যুক্ত হওয়ায় কর্মসূচির আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫০ কোটি ডলারে। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৩ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় শর্ত বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে স্থগিত থাকে।
পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আগের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পরিবর্তে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়টি সামনে আসে। গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আইএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন তিন বছরের কর্মসূচির জন্য চিঠি দেন। সরকারের প্রত্যাশা, নতুন কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ থেকে ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন পাওয়া যেতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সরকার বিশ্বব্যাংকের বাজেট সহায়তা এবং অন্যদিকে আইএমএফের ব্যালান্স অব পেমেন্ট সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আগের কর্মসূচির অভিজ্ঞতাও গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, এনবিআরের সংস্কার, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।’
ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ নিশ্চয়ই এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছতে চাইবে, যেখানে শর্তগুলো বাস্তবসম্মত এবং বাস্তবায়নযোগ্য হবে। একই সঙ্গে আইএমএফও অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার কর্মসূচি নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। অর্থাৎ উভয় পক্ষই নিজ নিজ অগ্রাধিকার ও বাস্তবতা বিবেচনায় আলোচনা এগিয়ে নেবে। আলোচনা সফল হলে তা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব সংস্কার আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই বাস্তবায়ন করতে হবে। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণের হার বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা কেবল


