শিরোনাম

South east bank ad

অস্তিত্ব টেকানোর নামে ক্ষত বাড়াচ্ছে জনতা ব্যাংক

 প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন   |   ব্যাংক

অস্তিত্ব টেকানোর নামে ক্ষত বাড়াচ্ছে জনতা ব্যাংক

যেকোনো ব্যাংকের আয়ের প্রধান উৎস বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে আদায়কৃত সুদ। এ আয় দিয়েই ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানো হয়। কিন্তু জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিতরণকৃত ঋণ সম্পদ না হয়ে গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকের ৭০ শতাংশেরও বেশি ঋণ এখন খেলাপি। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫ সালে সুদ খাতে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি লোকসান গুনেছে ব্যাংকটি। ফলে বছর শেষে জনতা ব্যাংকের পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকায়।

লোকসানের প্রাথমিক এ হিসাব অবশ্য চূড়ান্ত নয়। খেলাপি ঋণ, সঞ্চিতি ও মূলধন ঘাটতির পরিমাণ চূড়ান্ত এবং নিরীক্ষা শেষ হলে তবেই নিট লোকসানের চিত্র পাওয়া যাবে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বলছে, নিরীক্ষার পর লোকসানের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছাড়াবে ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং মূলধন ঘাটতি ছাড়াবে ৬৬ হাজার কোটি টাকা।

আর্থিক সংকট কাটাতে উচ্চ সুদের আমানত সংগ্রহে জোর দিয়েছে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। গত দেড় বছরে ব্যাংকটি প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করেছে, যার বেশির ভাগই উচ্চ সুদের। বিশ্লেষকরা বলছেন, ১০-১২ শতাংশ সুদে নেয়া এ আমানত দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকটির জন্য আরো ঝুঁকি তৈরি করছে। জনতা ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংকটির সংগৃহীত আমানতের ৫৫ শতাংশই উচ্চ সুদের। মুনাফা নয়, বরং সংগৃহীত এ আমানত থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছে ব্যাংকটি।

তবে আর্থিক এ বিপর্যয়ের মধ্যেও জনতা ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন ফেরেনি। তড়িঘড়ি করে গত ৭ ডিসেম্বর ব্যাংকটির ২৬ কর্মকর্তাকে উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) থেকে দেয়া এ পদোন্নতির ক্ষেত্রে জনপ্রতি ২০-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুস গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে। ঋণ বিতরণে ঘুস গ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন পদোন্নতি ও বদলির মাধ্যমে ঘুস নিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন।

অবশ্য ব্যাংকের আর্থিক নাজুক পরিস্থিতির কথা স্বীকার করলেও পদোন্নতিতে ঘুস গ্রহণের অভিযোগ সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর এ পদে যোগ দেন তিনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যে ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৭০ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে, তার পক্ষে মুনাফা করা খুবই কঠিন কাজ। গত বছর জনতা ব্যাংকের পরিচালন লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু সময়োপযোগী কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ায় সে লোকসান সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার আশপাশে রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০১২ সালে বিপর্যয়ের শিকার হওয়া বেসিক ব্যাংক এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। জনতা ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়াতেও সময় লাগবে।’

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের বিপর্যয়ের সূত্রপাত ২০০৯ সালে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর অন্য ব্যাংকের মতো এ ব্যাংকেও রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে পর্ষদ গঠন করা হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ, কর্মীদের পদোন্নতি, ঋণ বিতরণসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা হতো রাজনৈতিক বিবেচনায়। এ সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে জনতা ব্যাংক। বেক্সিমকো, এস আলম, এননটেক্স, ক্রিসেন্টসহ বেশকিছু বড় গ্রুপ ব্যাংকটি থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। এসব ঋণ এখন খেলাপির খাতায়।

জনতা ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ২ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান দিয়েছে। ওই বছর সুদ খাতে ব্যাংকটির লোকসান ছিল ৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে এসে এ লোকসান আরো বেড়েছে। গত বছর জনতার পরিচালন লোকসান দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকায়। সুদ খাতে বড় লোকসান দিলেও ব্যাংকটি ২০২৫ সালে সুদ-বহির্ভূত খাত থেকে (বিল-বন্ডে বিনিয়োগ, ফি ও কমিশন) ২ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা আয় করতে পেরেছে। ২০২৪ সালে কর পরিশোধ, সঞ্চিতি সংরক্ষণসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে জনতা ব্যাংকের নিট লোকসান ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা দাঁড়ায়। তবে গত বছর তথা ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট লোকসান বেড়ে ৫ হাজার কোটি টাকায় ঠেকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বড় লোকসানের মধ্যেও জনতা ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় বাড়ছে। ২০২৪ সালে এ খাতে ব্যাংকটির ব্যয় ছিল ১ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। গত বছর এ ব্যয় বেড়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির এ পরিস্থিতির মধ্যেও ব্যাংকটির বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঘুস লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের এমডি মো. মজিবর রহমান বলেন, ‘অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এজিএম থেকে ডিজিএম পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। পদোন্নতির বোর্ডে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিও ছিলেন। ১২০ জনের মধ্যে মাত্র ২৬ জন পদোন্নতি পাওয়ায় কথা উঠছে। আমি যোগদানের পর ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সুশাসন ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি। কিছু কর্মকর্তা বছরের পর বছর ধরে একই বিভাগে কাজ করে আসছিলেন। নীতি অনুযায়ী যাদের একই অফিসে তিন বছর হয়ে গেছে, তাদের ভিন্ন অফিসে বদলি করেছি।’

অবশ্য পদোন্নতি ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ও কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাংকটির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএমডিসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আর্থিক দৈন্যের মধ্যেও জনতা ব্যাংকে পদোন্নতি এবং এক্ষেত্রে ঘুস লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ভালো হলে, সম্প্রসারণ হলে তবেই লোকবলের দরকার হয়। পদোন্নতি দিতে হয়। কিন্তু জনতা ব্যাংক যে পরিস্থিতিতে আছে, তাতে তো পদোন্নতি দেয়াটা অর্থহীন। বর্তমান পরিস্থিতিতে জনতা ব্যাংকের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেয়া দরকার। যে জনবল ব্যাংকের ক্ষতি ঠেকাতে পারে না, তাদের পদোন্নতি দিয়ে লাভ কী?’

জনতার মতো পরিস্থিতিতে পড়লে যেকোনো ব্যাংকের পক্ষেই ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের এ মুখপাত্র। তিনি বলেন, ‘আর্থিক দুর্দশায় পড়লে যেকোনো ব্যাংকই উচ্চ সুদের আমানত সংগ্রহ করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে। বিপদ কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটির কিছু ভালো দিক আছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ফলাফল সুখকর নয়। জনতা ব্যাংক যে পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেটি থেকে উত্তরণের উপায় হলো ঋণ আদায়, পুনঃতফসিল, জামানতের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি।’

জনতা ব্যাংকের মতো এত বড় অংকের না হলেও ২০০৯ সাল-পরবর্তী লুণ্ঠনের শিকার হয় রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। ওই সময় বেনামি বিভিন্ন কোম্পানির নামে ব্যাংকটি থেকে বের করে নেয়া হয় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবারের ঘনিষ্ঠ শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পর্ষদ বেসিক ব্যাংক লুণ্ঠনে নেতৃত্ব দেয়। ৪ হাজার কোটি টাকার সেই ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকটি। বরং গত এক যুগের বেশি সময়ে বেসিক ব্যাংকের পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটি কেবল নিট লোকসান দিয়েছে ৫ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। এর পরও বর্তমানে বেসিক ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ বা ৮ হাজার কোটি টাকাই খেলাপি। বেসিক ব্যাংককে বাঁচানোর কথা বলে বাজেট থেকে ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা মূলধনও জোগান দিয়েছে সরকার। তার পরও এখনো ব্যাংকটির ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধন ঘাটতি রয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের মতো না হলেও খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকও। এক্ষেত্রে কেবল সোনালী ব্যাংক কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে। নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে সরকারি বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকও (রাকাব)। সবক’টি ব্যাংকই বর্তমানে মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে আর টেনে নেয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘জনগণের করের টাকা থেকে মূলধন জোগান দিয়ে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে যুগের পর যুগ টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সুশাসনের ঘাটতি ও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে জনতা ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংকগুলোতে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে সেটি মেনে নেয়া যায় না। কোনো ব্যাংকের যখন ৭০ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে যায়, সেটিকে আর বাঁচিয়ে রাখার কোনো অর্থও হয় না।’

ড. ফাহমিদা খাতুন বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদেও রয়েছেন। জনতা ব্যাংকের বিদ্যমান পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জনতাসহ আরো অনেক ব্যাংকের পরিস্থিতি এখন খুবই খারাপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কয়টা ব্যাংককে মূলধন দিয়ে বাঁচাতে পারবে। দুর্বল হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোর বিষয়ে একটি কঠোর সিদ্ধান্তে আসতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি জনবল থাকলেও দক্ষতার যথেষ্ট ঘাটতি আছে। আবার এ ব্যাংকগুলোতে কার্যকর সুশাসনও নেই।’

BBS cable ad

ব্যাংক এর আরও খবর: