বন-পাহাড়-দুর্গম জনপদে আর্থিক সেবায় এজেন্ট ব্যাংকিং
একসময় ব্যাংক মানেই ছিল শহরের পাকা রাস্তা, উঁচু ভবন আর কাচঘেরা শাখা। কিন্তু সময় বদলেছে।
ব্যাংকিং সেবা এখন পৌঁছে গেছে দেশের এমন সব প্রান্তে, যেখানে একসময় ব্যাংক শাখা ছিল কল্পনাতীত। বনাঞ্চলের নিভৃত গ্রাম, নদীভাঙনে গড়ে ওঠা চর, দুর্গম পাহাড়ি পথ কিংবা ঘূর্ণিঝড়প্রবণ উপকূল–সবখানেই এখন ব্যাংকিং সেবা মানুষের হাতের নাগালে। গ্রামের কাঁচা রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি ঘর, টিনের চালার নিচে বসে লেনদেন করছেন স্থানীয় প্রতিনিধি—এটাই এখন অনেক অঞ্চলের বাস্তব ব্যাংকিং চিত্র। এ পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ব্র্যাক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং, যা পৌঁছে গেছে সেসব এলাকায়, যেখানে পৌঁছানোই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি চ্যালেঞ্জিং। নদীভাঙন, ঘন বনাঞ্চল, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চল—এসব জায়গায় প্রচলিত ব্যাংক শাখা স্থাপন ব্যয়বহুল ও জটিল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে লাখো মানুষ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন। এজেন্ট ব্যাংকিং সেই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দিয়েছে। এখন ব্যাংকই পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাহকের কাছে স্থানীয় বিশ্বস্ত উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে। এতে সময়, খরচ ও ভোগান্তি কমেছে, আর বেড়েছে মানুষের আস্থা।
বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং ১ হাজার ১২০টি আউটলেটের মাধ্যমে দেশের বনাঞ্চল, চরাঞ্চল, পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকায় সেবা দিচ্ছে। এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকরা পাচ্ছেন– সেভিংস ও কারেন্ট অ্যাকাউন্ট; ডিপিএস ও এফডিআর; দেশী-বিদেশী রেমিট্যান্স; ক্ষুদ্র ও উদ্যোক্তা ঋণ; সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বিতরণ ও ডিজিটাল লেনদেনসহ মৌলিক ব্যাংকিং সেবা। ফলে শহরকেন্দ্রিক ব্যাংকিং ধারণা ভেঙে গড়ে উঠেছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক নেটওয়ার্ক।
সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চল শ্যামনগর, পাইকগাছা, দাকোপ, ফকিরহাট ও কয়রায় স্থাপিত ১৭টি আউটলেট এখন স্থানীয় মানুষের নিয়মিত ব্যাংকিং কেন্দ্র। আগে যেখানে নিরাপদ সঞ্চয়ের সুযোগ ছিল সীমিত, এখন সেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে সঞ্চয় করছেন।
চর ও উপকূলীয় অঞ্চল যেমন চরফ্যাশন, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, হাতিয়া, সুবর্ণচর, মোংলা ও কলাপাড়ায় ৭৬টি আউটলেটের মাধ্যমে সেবা পৌঁছেছে। পাশাপাশি রামগড়, পানছড়ি, মানিকছড়ি, মাটিরাঙা, লংগদু ও দীঘিনালাসহ পাহাড়ি অঞ্চলে ১১টি আউটলেট নিয়মিত সেবা দিচ্ছে। এ বিস্তারের ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে এসেছে গতি, কমেছে নগদের ওপর নির্ভরতা এবং বেড়েছে আর্থিক স্বচ্ছতা।
দুর্গম অঞ্চলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রসারের ফলে মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রমে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ৬০ হাজারেরও বেশি গ্রাহক নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছেন, যাদের অধিকাংশই প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং সেবার আওতায় এসেছেন। এ অন্তর্ভুক্তির ফলে ২০০ কোটি টাকারও বেশি আমানত সংগ্রহ হয়েছে এবং ৬৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ সুবিধা পেয়েছেন গ্রাহকরা; যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করেছে।


