৩৩ শতাংশ মালিকানার পরও আইএফআইসি ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের
দেশে সরকারি-বেসরকারি মালিকানায় গড়ে ওঠা ব্যাংকগুলোর একটি আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি। চার দশক আগে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ব্যাংকটির শেয়ারের প্রায় ৩৩ শতাংশের মালিকানা অর্থ মন্ত্রণালয়ের।
যদিও এক-তৃতীয়াংশ শেয়ারের মালিকানা সত্ত্বেও ব্যাংকটির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি সরকার। বরং অতীতে ব্যাংকটি প্রভাবশালী ও অলিগার্ক শ্রেণীর অনিয়ম-দুর্নীতি এবং লুণ্ঠনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের শাসনামলে আইএফআইসি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের হাতে। যদিও ব্যাংকটিতে তার মালিকানাধীন শেয়ার ছিল মাত্র ২ শতাংশ। ২০১০ সালে চেয়ারম্যান হওয়ার পর এ পদে তিনি বহাল ছিলেন গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন হওয়া পর্যন্ত। বেক্সিমকো গ্রুপের এ কর্ণধার অস্তিত্বহীন ও বেনামি ২৮টি কোম্পানির মাধ্যমে সে সময়ে ব্যাংকটি থেকে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি লোপাট করেছেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইএফআইসির কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের মালিকানাধীন শেয়ারের বিপরীতে সবসময়ই ব্যাংকটির পর্ষদে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুই-তিনজন পরিচালক নিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে তারা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেননি। বরং নিজেরাও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও আত্মীয়স্বজনের চাকরির বিনিময়ে সেসবের সহযোগী হয়েছেন।
সালমান এফ রহমানের অবর্তমানে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিতে নতুন একটি পক্ষ চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন আইএফআইসি ব্যাংকের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তারা বলছেন, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক থেকেই আইএফআইসি ব্যাংক রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও অলিগার্কদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। যখন যে দল ক্ষমতায় যায়, সে দলের সুবিধাভোগীরা ব্যাংকটির গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলে নেন। এক্ষেত্রে মাত্র ২ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা সালমান এফ রহমানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির শেয়ারদর মাত্র ৫ টাকা। সে হিসাবে ২০ কোটি টাকা হলেই ব্যাংকের ২ শতাংশ শেয়ার কেনা যাচ্ছে। এ সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী একটি অংশ পুরো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইএফআইসি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই সময় জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার মো. মেহমুদ হোসেনকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। এক-তৃতীয়াংশ শেয়ারের মালিকানা সরকারের থাকা সত্ত্বেও আইএফআইসি ব্যাংকের পর্ষদে অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে জানতে চাইলে মেহমুদ হোসেন বলেন, ‘সাধারণত ব্যাংকের মালিকানায় অংশীদারত্ব যার বেশি, তার নিয়ন্ত্রণও বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু আইএফআইসিতে বিগত সময়ে আমরা সেটি দেখিনি। বরং রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা এ ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণ করেছে। এক্ষেত্রে সরকারের প্রতিনিধিরা প্রভাবশালীদের আজ্ঞাবহের ভূমিকা রেখেছে।’
ব্যাংকটিকে এ পরিস্থিতি থেকে বের করে আনা দরকার বলে মনে করেন মেহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘অতীতে সরকারের নিযুক্ত ব্যক্তিরা স্বাধীনভাবে ও সততার সঙ্গে ভূমিকা রাখলে ব্যাংকটি লুণ্ঠনের শিকার হতো না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতির সুরাহা হওয়া দরকার। অন্যথায় সরকার নিজের শেয়ারের অংশ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে পারে। তাহলে অন্তত ব্যাংক লুটের দায় সরকারের ওপর যাবে না।’
আইএফআইসি ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা এখন ১৯২ কোটি ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪৭। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের গত ৩০ জুনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা অর্থ মন্ত্রণালয়ের। আর ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। ব্যাংকটির দশমিক ৬৪ শতাংশ শেয়ার বিদেশীদের হাতে রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আইএফআইসি ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ছিল মাত্র ৫ টাকা। যদিও ব্যাংকটির শেয়ারের অভিহিত মূল্যই ১০ টাকা। শেয়ারমূল্যের মতো ব্যাংকটির লভ্যাংশ ঘোষণার পরিস্থিতিও নাজুক। দুই বছর ধরে ব্যাংকটি লোকসানে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ব্যাংকটি নিট লোকসান দিয়েছে ২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। আর ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ১০২ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছিল।


