বিশ্ববাজারে কৃষিজাত পণ্যের দাম দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে
দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে কৃষিজাত পণ্যের দাম দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সার সংকটের আশঙ্কা এবং ফলন কম হওয়ার উদ্বেগে বিশ্বজুড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নতুন করে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবর হেলেনিক শিপিং নিউজ।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ ১০টি কৃষিজাত পণ্যের দামের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘ব্লুমবার্গ এগ্রিকালচার স্পট ইনডেক্স’ সূচক টানা তিন মাস ধরে বাড়ছে। বর্তমানে এ সূচক ২০২৩ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হওয়ার আগে বিশ্ববাজারের চিত্র ছিল ভিন্ন। তখন পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় অধিকাংশ খাদ্যশস্যের দাম ছিল নিম্নমুখী ও স্থিতিশীল। কিন্তু বর্তমানে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া থেকে আমেরিকা সব অঞ্চলের কৃষকরাই এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। একদিকে ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা, অন্যদিকে তীব্র খরা। এ দুই সংকটের প্রভাবে আটা, ময়দা ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। মূলত সার আমদানি বিঘ্নিত হওয়া এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াই এর মূল কারণ।
কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে গম ও ভুট্টার ওপর। এ দুটি ফসল চাষে প্রচুর সার প্রয়োজন হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) গমের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে গমের দাম দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একইভাবে দুই মাসে ভুট্টার দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ, যা এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশ্বের বড় উৎপাদনকারী দেশগুলোর কৃষকরা এখন টিকে থাকার লড়াই করছেন। জ্বালানি ও সারের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক চাষাবাদের এলাকা কমিয়ে দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, খরচ সামলাতে না পেরে কম জমিতে ফসল বোনা ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। ফলে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে ফসল সরবরাহ আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফ্রান্সে সারের দাম বাড়ায় কৃষকরা ভুট্টা চাষ কমিয়ে দিয়েছেন, ফলে প্যারিসের বাজারে ভুট্টার দাম ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
প্রকৃতির বৈরী আচরণ ও এল নিনোর প্রভাব এ সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান গম উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোয় দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিয়েছে, যা গমের দামকে আরো উসকে দিচ্ছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়ার আবহাওয়ার পূর্বাভাসও খুব একটা ভালো নয়। এসব দেশে যদি ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে বিশ্ববাজারে গমের সংকট আরো তীব্র হবে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি যদি আরো দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে সার ও জ্বালানি সংকটে কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন খরচ আরো বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্ববাজারের এ অস্থিতিশীলতা যদি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তবে আগামী দিনগুলোয় খাদ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।


