শিরোনাম

South east bank ad

পোশাক শিল্পকে রক্ষা জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থেই অপরিহার্য

 প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন   |   গার্মেন্টস/টেক্সটাইল

পোশাক শিল্পকে রক্ষা জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থেই অপরিহার্য


মো. মফিজুর রহমান 

বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসাবে স্বীকৃত তৈরি পোশাক খাত। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার নেতিবাচক প্রভাব এ খাতের ওপর জেঁকে বসেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, গত আট মাসে পোশাক রপ্তানি ৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিশেষ করে গত মার্চে রপ্তানি আয়ের যে বড় পতন (প্রায় ৭৭ কোটি ডলার) দেখা গেছে, তা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।

 

পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতির মূলে রয়েছে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইরান-ইসরাইল ও রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। এর ফলে যেমন উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, তেমনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নতুন ক্রয়াদেশ আসার হারও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও সমস্যা কম নয়; ডলার সংকট ও এলসি জটিলতার কারণে কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা উৎপাদন চক্রকে ব্যাহত করছে।


তৈরি পোশাক খাত দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্প। মোট রপ্তানি আয়ে বিরাট ভূমিকা রাখছে এই শিল্প। কিন্তু বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, জ্বালানিসংকট, উচ্চ সুদহার এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাতটি গভীর সংকটের সম্মুখীন। রপ্তানি আয় কমেছে। 

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, তিন বছরে প্রায় চার শ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও বহু কারখানা আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও শুল্কের প্রভাবে পোশাক রপ্তানি নিম্নমুখী। এ পরিপ্রেক্ষিতে পোশাকশিল্প খাত রক্ষায় আগামী বাজেটে সরকারের কাছে নীতি সহায়তা চেয়েছে বিজিএমইএ। রবিবার এনবিআর ভবনে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বিজিএমইএ সভাপতি এ দাবি তুলে ধরেন। প্রস্তাবনায় পোশাকশিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ হারে আয়কর কাটা থেকে অব্যাহতি, রপ্তানির বিপরীতে উৎসে কর হ্রাস করা ছাড়াও সোলার পিভি সিস্টেমের সরঞ্জামে শুল্ক রেয়াতি হারে আমদানি সুবিধার দাবি জানায় বিজিএমইএ। পোশাকশিল্প রক্ষায় এসব প্রস্তাব যৌক্তিক। কর্তৃপক্ষের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এগুলো বিবেচনা করা উচিত।


বাস্তবতা হচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রপ্তানি আয় প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে ২০২৫-এর আগস্ট থেকে রপ্তানি নিম্নমুখী। কারখানাগুলো পরিপূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। অথচ নির্ধারিত ব্যয়ের বোঝা ঠিকই বইতে হচ্ছে। যা সব উদ্যোক্তার পক্ষে সহনীয় নয়। অনেকের পক্ষে অসম্ভব। তারাই কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। বিরূপ প্রভাব পড়েছে সার্বিক জাতীয় উৎপাদন ও আয়ে। অসংখ্য শ্রমিক-কর্মচারী কাজ হারিয়ে বিপন্ন হয়েছেন।  বিভিন্ন ব্যাংকে বন্ধ কারখানাগুলোর ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। খেলাপি ঋণের অঙ্ক বাড়ছে। এসব বহুমুখী নেতিবাচকতা মোকাবিলা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ না হলেও তার পথরেখা তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব। আসন্ন জাতীয় বাজেটে যেন তার লক্ষ্যে উপযুক্ত নীতি সহায়তার পরিকল্পনা ও বরাদ্দ থাকে-সেটাই সবার চাওয়া। ব্যাপক শ্রমঘন পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে নানাভাবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতি এবং সামাজিক শৃঙ্খলায়।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, জানুয়ারি ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত তাদের সদস্যভুক্ত ১১৩টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় ৯৬,০০০-এরও বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়ে বেকার। যদিও এই সময়ে নতুন কিছু কারখানা চালু হয়েছে, কিন্তু বন্ধ হওয়া কারখানার সংখ্যা এবং বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক। পোশাকশিল্প প্রধানত ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হওয়ায়, দুই অঞ্চলেই অস্থিরতার প্রভাব বেশি অনুভূত হচ্ছে। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামের ইপিজেডসহ বিভিন্ন এলাকায় কারখানা বন্ধের ঘটনা বেড়েছে। শুধু চট্টগ্রামেই গত ৬ মাসে ৫২টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য জানা গেছে।

মনে রাখতে হবে, তৈরি পোশাক খাত শুধু বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎসই নয়, বরং দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র। আমরা আশা করি, সরকার পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে শিল্পটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক ও নীতিনিষ্ঠ সহায়তা প্রদানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এই শিল্পকে রক্ষা করা কেবল ব্যবসায়িক ইস্যু নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থেই অপরিহার্য।

লেখক : বাজার বিশ্লেষক ও অর্থ ব্যবস্থাপনা পরামর্শক। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গোল্ড বেল কর্পোরেশন। 


BBS cable ad

গার্মেন্টস/টেক্সটাইল এর আরও খবর: