রফতানিতে বৈচিত্র্য আনতে অন্যতম খাত হতে পারে প্রযুক্তিপণ্য
দেশের রফতানি খাত এখনো তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশই আসে এ খাত থেকে। যদিও সেই তৈরি পোশাকের নিজস্ব কোনো ব্র্যান্ড নেই বাংলাদেশের। এক্ষেত্রে রফতানিতে বৈচিত্র্য আনতে প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিপণ্য অন্যতম খাত হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল ‘বাংলাদেশ থেকে বিশ্বে: উৎপাদন ও রফতানির স্বপ্ন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন। চার দিনব্যাপী ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬’-এর অংশ হিসেবে এ আলোচনার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। দেশের রফতানি, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ৫০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয় এখনো পোশাক খাতনির্ভর। এর বাইরে বাকি খাতগুলোর রফতানি আয় নগণ্য। একটি মাত্র খাতনির্ভর রফতানি আয় কখনো টেকসই হতে পারে না। এক্ষেত্রে নতুন ফ্রন্টিয়ার হতে পারে প্রযুক্তি ও ডিভাইস। তবে এজন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন ও রফতানির জন্য গবেষণা এবং উন্নয়ন ব্যয়ও বাড়াতে হবে।’
আলোচনায় রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, ‘একটি মাত্র খাতনির্ভর হয়ে পড়ায় আমাদের রফতানি আয় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্যায়ণ নিয়ে ভাবতে হবে। ইপিবি সামনে একটি মেলা করতে চায়, যেখানে বাংলাদেশের রফতানিযোগ্য পণ্যগুলো প্রদর্শন করা হবে। সেখানে তথ্যপ্রযুক্তিকেও গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরা হবে। যাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্য পরিচিতি পায় এবং রফতানির বাজার বড় হয়।’
বিশ্বব্যাংকের সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ উবাহ থমাস উবাহ বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন অনেক বড় প্রযুক্তিবাজার, যা রফতানিযোগ্য। এখানে অনেক ট্যালেন্ট আছে, যাদের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করার ব্যবস্থা করতে হবে। বেসরকারি খাতে সরকারের নীতির সঙ্গে ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রটাও উন্মুক্ত করতে হবে। তাহলে বাংলাদেশ থেকেই ইউনিকর্ন কিছু বের হয়ে আসতে পারে।’
আরএফএল ইলেকট্রনিকসের নির্বাহী পরিচালক নূর আলম বলেন, ‘আমাদের ইলেকট্রনিকসের সব যন্ত্রাংশ এখনো আমদানিনির্ভর। কিন্তু সেটার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ ডলারের দাম বেশি, আবার ট্যাক্স দিতে হয়। এর মধ্যে আবার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও স্বল্পমূল্যে দেয়ার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।’
প্যানেল আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন ওয়ালটন ডিজি-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের গ্লোবাল বিজনেসের নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রউফ। তিনি বলেন, ‘চীনের পর দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ইলেকট্রনিক কারখানা ওয়ালটনের। বর্তমানে আমরা রোবোটিক সিস্টেম ব্যবহার করছি। নিজেদের সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান তৈরি করা এবং রফতানি পণ্যে সবসময় আমরা এগুলো ব্যবহার করি। তবে রফতানির ক্ষেত্রে অনেক বাধা রয়েছে। আমাদের দেশে ২২০ ভোল্টের বিদ্যুৎ ব্যবহার করি, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ১১০ ভোল্ট। ফলে শুরুতেই আমরা বাধাগ্রস্ত হয়েছি। নানা ধরনের বাধা দূর করতে না পারলে রফতানি খাতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’
শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘ইলেকট্রনিকসে আমাদের সঠিক পলিসি প্রণয়ন করতে হবে। আগামী বছর স্মার্টফোনের বাজার প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। বাংলাদেশ যদি তার ৫ শতাংশও ধরতে পারে, তাহলেও ৫০ বিলিয়ন ডলার অর্জন করতে পারবে।’
একই দিন প্রদর্শনীতে ‘অ্যাকসেস টু ফাইন্যান্স টুওয়ার্ডস অপরচুনিটিজ: ফাইন্যান্সিং ডিজিটাল ডিভাইস ফর স্টুডেন্টস টু বিল্ড অ্যান ইন্টেলিজেন্ট সোসাইটি’ শীর্ষক আরো একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। ‘স্বপ্ন থেমে থাকা বদলাতে হবে’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘দেশে ডিভাইসের ব্যবহার বাড়াতে হলে আগে ডিভাইসকে সহজলভ্য করতে হবে। স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহার অন্তত ৮০ শতাংশে নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্তে ডিজিটাল ডিভাইস সরবরাহ করা দরকার। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার এবং তফসিলি ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সুদে, ক্ষেত্রবিশেষে বিনা সুদে অর্থায়ন করা দরকার।’ কৃষি ঋণের মতো শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ডিজিটাল ডিভাইস ঋণের জন্য একটি পৃথক নীতিও তৈরি করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিল্ডকন কনসালট্যান্সির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে সেমিনারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এএসএম আমানুল্লাহ বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বছরে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েট হলেও মাত্র ১০ শতাংশ শিল্প খাতে যুক্ত হয়। মূলত ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ না থাকায় তারা চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।’
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আলিফ রুদাবা, বিশ্বব্যাংকের ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট সুপর্ণা রায়, আইসিটি বিভাগের (অর্গানাইজেশনাল সাপোর্ট উইং) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দীন এবং অ্যাক্সেটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আদিল হোসেন নোবেল।


