ডিজিটালাইজেশনের অভাবে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে
দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের কাঠামো ও নীতিগত সমস্যা রয়ে গেছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এ যুগে বৈশ্বিক লেনদেন প্রায় পুরোটাই ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় চলে গেলেও বাংলাদেশ এখনো কাগুজে নথিপত্র থেকে বের হতে পারেনি। সনাতন ও আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে এখনো ধীরগতি রয়ে গেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
রাজধানীর মিরপুরে গতকাল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বক্তারা। এ সময় ‘ট্রেড সার্ভিসেস অপারেশনস অব ব্যাংকস’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন উত্থাপন ও পর্যালোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে আজ বা কাল স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণ হতেই হবে। কিন্তু সেজন্য প্রস্তুতি এখনো বেশ দুর্বল।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে কোনো কোনো পণ্যে ২০ শতাংশ ভ্যালু সংযোজন করেই আমরা “মেড ইন বাংলাদেশ” হিসেবে রফতানি করছি। কিন্তু এলডিসি উত্তরণের পর কোনো পণ্যের ন্যূনতম ৬০ শতাংশ নিজেদের না হলে “মেড ইন বাংলাদেশ” নামে রফতানি করা যাবে না। এ ধরনের নানা শর্ত, নিয়মাবলি ও প্রতিযোগিতা মোকাবেলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।’ এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে বলেও মন্তব্য করেন এ অধ্যাপক।
আহসান হাবীবের সঙ্গে গবেষণা দলে আরো ছিলেন বিআইবিএমের সহকারী অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ ও রাহাত বানু, প্রভাষক রাজিব কুমার দাস, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্টের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আরাফাত আলী ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এটিএম নেছারুল হক।
গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রেড ফাইন্যান্সে দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ। কোনো কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে এটি ৮০ শতাংশেরও বেশি। এছাড়া ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত মার্জিন আরোপ, উচ্চ সুদহার এবং ডিজিটাল আইনি কাঠামোর অভাবে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংকগুলো এলসি খোলার ক্ষেত্রে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর ১০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ মার্জিন চাপিয়ে দিচ্ছে। অধিকাংশ ব্যাংকেই ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য নির্দিষ্ট ‘এসএমই ট্রেড ফাইন্যান্স ডেস্ক’ বা বিশেষায়িত সেবা নেই।
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটালাইজেশনেও বেশ পিছিয়ে আছে ব্যাংকগুলো। ২০২৫ সালের জাতিসংঘ বাণিজ্য সহজীকরণ জরিপে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পেপারলেস বাণিজ্যের স্কোর ৭০ দশমিক ৩৭ শতাংশ হলেও আন্তর্জাতিক বা ক্রস-বর্ডার পেপারলেস বাণিজ্যের স্কোর মাত্র ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এর মূল কারণ ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিংসহ অন্যান্য ডিজিটাল নথিপত্রের জন্য ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তিগত ও আইনি প্রস্তুতির অভাব, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বেশ প্রভাব রাখছে। এছাড়া বাংলাদেশ এখনো জাতিসংঘের ‘মডেল ল অন ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারেবল রেকর্ডস’ (এমএলইটিআর) গ্রহণ বা এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইনি কাঠামোও তৈরি করতে পারেনি। ফলে ডিজিটাল মাধ্যমে বাণিজ্যিক নথিপত্র আদান-প্রদানের কোনো আইনি স্বীকৃতি বাংলাদেশে নেই, যা দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রমকে আরো দ্রুত, নিরাপদ ও কাগজবিহীন করতে ইলেকট্রনিক ট্রেড ডকুমেন্টের জন্য আধুনিক আইনগত ও ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে গ্রাহকসেবার মান অক্ষুণ্ন রেখে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং ট্রেড-বেজড মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আরো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘উদ্ভাবনী আর্থিক পণ্য ও ঝুঁকি ভাগাভাগির কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ট্রেড ফাইন্যান্সের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে পণ্যভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ আরো জোরদার করতে হবে। একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও কার্যকর ট্রেড ফাইন্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো দরকার।’
কর্মশালায় আলোচক হিসেবে অংশ নেন এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া। তিনি বলেন, ‘বিগত দুই বছর আমরা অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। এর মধ্যে ডলার সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও ব্যাংক খাতের সংকট—এগুলো আমাদের ট্রেড সার্ভিসকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। তবে এসবের বাইরে গিয়েও ট্রেড সিস্টেম বা বিশেষ করে ট্রেড সার্ভিসের ডিজিটালাইজেশনের কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘ট্রেড সার্ভিসের টেবিলে প্রতিটা কাজের যে প্রক্রিয়া, তা যদি একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের আওতায় চলে আসে, তাহলে আমরা খুব সহজেই সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিতে পারব।’
অনুষ্ঠানে আরো কথা বলেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান, প্রাইম ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাজ্জাদ হায়দার চৌধুরী ও সিটি ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ।


