শিরোনাম

South east bank ad

কাগজ আমদানিতে মূল্য কারসাজির অভিযোগ

 প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন   |   আমদানী/রপ্তানী

কাগজ আমদানিতে মূল্য কারসাজির অভিযোগ

স্বল্পমূল্যে তৈরি কাগজ আমদানি এবং আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের কারণে দেশের কাগজ শিল্প গভীর সংকটে পড়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ)। সংগঠনটির অভিযোগ, প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য দেখিয়ে তৈরি কাগজ আমদানি করায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, একই সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার কারণে দেশীয় কাগজ শিল্প টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে আমদানিকৃত তৈরি কাগজের ন্যূনতম কর নির্ধারণযোগ্য মূল্য প্রতি মেট্রিক টন ৯৪৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ২৯.৫ ইঞ্চি রোল, ২০/৩০ শিট এবং ৭০/৮০ জিএসএম অফ-হোয়াইট ন্যাচারাল শেড প্রিন্টিং পেপার আমদানি নিষিদ্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিপিএমএর সচিব এ কে এম নওশেরুল আলম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছেন।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে কাগজ শিল্পে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং পরোক্ষভাবে প্রায় অর্ধকোটি মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।
বিপিএমএর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যে দেশের ৮০টি কাগজ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। আরও ২৬টি মিল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এতে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।

মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (মার্কেটিং) মোহাম্মদ ইয়ারুল ইসলাম বিদ্যুৎ জানান, এনসিটিবির কাগজের চাহিদা ও সরবরাহ বিষয়ে তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সেখানে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০টি রাইটিং ও প্রিন্টিং পেপার মিল উৎপাদনে রয়েছে। এসব মিলের সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে দেশের মোট বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদা পূরণের পরও প্রায় ৭ লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।

তার ভাষ্য, সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা দিলে দেশীয় শিল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এনসিটিবির প্রয়োজনীয় সব কাগজ সরবরাহ করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে উদ্বৃত্ত উৎপাদন আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

ইয়ারুল ইসলাম বিদ্যুৎ বলেন, এনসিটিবির কাগজ সরবরাহের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেশের অনেক কাগজ মিল ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পাল্প আমদানি করেছে এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছে। এখন বিদেশ থেকে প্রস্তুত কাগজ আমদানি করা হলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল, বিনিয়োগ ও উৎপাদন পরিকল্পনা ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং কার্যকর মূলধনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।

তিনি আরও বলেন, অপ্রয়োজনীয়ভাবে তৈরি কাগজ আমদানি অব্যাহত থাকলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হবে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, বৈদেশিক মুদ্রার অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তার মতে, দেশীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দিলে কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং বাংলাদেশ আরও আত্মনির্ভরশীল শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগোতে পারবে।

বসুন্ধরা গ্রুপের সিনিয়র ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগে দেশে বাঁশ ও কাঠ থেকে পাল্প উৎপাদিত হলেও কাঁচামালের সংকটের কারণে বর্তমানে পুরো শিল্পই বিদেশ থেকে পাল্প আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, পাল্প আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি টনের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ৮৪০ মার্কিন ডলার ধরা হলেও প্রস্তুত কাগজ আমদানির সময় অনেক ব্যবসায়ী মাত্র ৬০০ মার্কিন ডলার মূল্য দেখিয়ে শুল্কায়ন করছেন। এতে দেশীয় শিল্প মারাত্মক প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে এবং একের পর এক কাগজ মিল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছেও চিঠি দেওয়া হয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, যেহেতু পাল্পের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ৮৪০ ডলার, তাই প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় যোগ করে প্রস্তুত কাগজের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু অন্তত ১ হাজার মার্কিন ডলারের কাছাকাছি নির্ধারণ করা উচিত। তিনি বলেন, ‘আমরা কাগজ আমদানি বন্ধ করার দাবি করছি না। আমরা শুধু চাই একটি সুষ্ঠু ও সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।’ তার দাবি, আন্ডার-ইনভয়েসিং অব্যাহত থাকলে দেশের কাগজ শিল্প আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং সরাসরি প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে।

কাগজ শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, একদিকে রাজস্ব ফাঁকি ও আন্ডার-ইনভয়েসিং রোধ করা, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা। বিপিএমএর দাবি, ন্যায্য কর নির্ধারণ, আন্ডার-ইনভয়েসিং প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় কাগজ শিল্প দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবেও বিকশিত হতে পারে। তবে এসব দাবি ও অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্যের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি।

BBS cable ad

আমদানী/রপ্তানী এর আরও খবর: