চাহিদা বাড়লেও জনবল ও কাঁচামাল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে কাগজ উৎপাদন
সাত দশক আগে প্রতিষ্ঠাকালে রাষ্ট্রায়ত্ত কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেডের (কেপিএম) বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩০ হাজার টন।
স্বাধীনতা-পূর্ব পাকিস্তানের দুই অংশের চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকত কেপিএমের কাগজ। এখনো সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাহিদা থাকলেও জনবল ও কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছে না বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মালিকানাধীন পেপার মিলটি।
জানা যায়, পার্বত্য রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কেপিএম সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ কোটি ৮ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮১ টাকায় ভালোমানের ৯১৪ টন কাগজ সরবরাহ করে। এর পরপরই সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে চাহিদাপত্র এলেও কাঁচামাল ও জনবল সংকটে বাড়তি উৎপাদনে যেতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। এতে ৩০ হাজার টন উৎপাদন সক্ষমতার মিলটি পরিচালনায় প্রতি বছরই লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বিসিআইসির তথ্যমতে, কেপিএমের মঞ্জুরীকৃত জনবলের সংখ্যা ২ হাজার ৩৭৭। তবে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২২৩ জন। অর্থাৎ ৯১ শতাংশ ঘাটতি জনবল দিয়ে কারখানা পরিচালনার কারণে লোকসান বেড়েই চলেছে। বর্তমানে দুটি ইউনিট দিয়ে দৈনিক ২৫ টন হিসাবে বার্ষিক ১০ হাজার টন উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জনবলের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে পেপার মিলটির কার্যক্রম।
কেপিএমের উৎপাদন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে তিন হাজার টন। সর্বশেষ ১৬ মার্চ পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৫৮৪ টন। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে উৎপাদন হয়েছে ২৮০ টন কাগজ। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ৯ দশমিক ৩৩ টন করে কাগজ উৎপাদন হয়। সারা বছর কাগজ উৎপাদন করা গেলে বর্তমান অবস্থায়ও ব্যয় মিটিয়ে লোকসান এড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নিয়মিত পাল্প সরবরাহ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে যেতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।
কেপিএমের বিক্রয় বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জাতীয় নির্বাচনে দ্রুত সময়ের মধ্যে কাগজ সরবরাহ করার পর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাহিদাপত্র আসছে। তবে মজুদ থাকা সাড়ে ছয় হাজার টন কাগজ থেকে সরবরাহ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলেও বড় পরিসরে বিক্রয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) জন্য বছরে ৭০ হাজার টনের কাগজের চাহিদা রয়েছে। এছাড়া দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে এ মিলের এসব কাগজ বিক্রির সুযোগ রয়েছে। কেপিএমের মহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন) মো. মইদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেপিএমের দুটি ইউনিটের মধ্যে একটি দিয়ে কাগজ উৎপাদন করা হয়। সারা বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে কারখানা চালু রাখার সুযোগ নেই। প্রতি মাসে ১০-১২ দিন উৎপাদন করেই বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হচ্ছে। সরকারি মিল হওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী, কাগজ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হলে বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়েই কারখানাটি ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।’ এজন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ ও জনবল নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
কেপিএমের তথ্যমতে, ১৯৫৩ সালে উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব বাগান এবং দেশীয় উৎস থেকে বাঁশ ও পাল্পউড সংগ্রহ করে কাগজ উৎপাদন করত। ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে কেবল নিজস্ব পাল্প ব্যবহার করেই সর্বোচ্চ ৩৪ হাজার ৩৩৪ টন কাগজ উৎপাদনের রেকর্ড গড়ে। তবে ১৯৭৫ সালে সিলেট থেকে পাল্প সংগ্রহ শুরু করে কেপিএম। ভালোমানের কাগজ উৎপাদনে আমদানীকৃত পাল্পের কিছু মিশ্রণ প্রয়োজন হলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে ধীরে ধীরে দেশীয় কাঁচামালের সরবরাহ আশঙ্কাজনক হারে কমতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১-১২ মৌসুমে কেপিএমের নিজস্ব পাল্প ব্যবহার আমদানীকৃত পাল্পের তুলনায় কমে যায়। ওই সময় ১৯৬৪ সালের পর সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৬৮২ টন পাল্প আমদানি করতে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। ফলে উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়।


