কুরবানির চামড়া সুরক্ষায় কঠোর নজরদারির উদ্যোগ
কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়া জাতীয় সম্পদ হিসাবে সংরক্ষণে এবার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য চামড়াশিল্পকে রক্ষা, পাচার রোধ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন একযোগে কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছেন। চামড়া ব্যবস্থাপনার বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে অর্থ বিভাগ ২০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বরাদ্দ দিয়েছে। অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে নানা কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
Advertisement
আরও দেখুন
আবহাওয়া পূর্বাভাস
অনলাইন নিউজলেট
সংবাদ বিশ্লেষণ সেবা
বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে কুরবানির চামড়ার দরপতন এবং সঠিক সংরক্ষণের অভাবে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া নষ্ট হওয়ার বিষয়টি সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। এ বছর যাতে কুরবানির চামড়ার বাজারে শৃঙ্খলা বজায় থাকে সে লক্ষ্যে আগেভাগে প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। এজন্য বিনামূল্যে লবণ বিতরণ, দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ, পাচার রোধে কড়াকড়ি, স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি এবং সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, অতীতে কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়া পানির দরে কিনে নেওয়া কিংবা অবহেলার মতো ঘটনা ঘটছে। অথচ দেশের অন্যতম জাতীয় সম্পদ এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি শিল্প খাত হিসাবে চামড়াশিল্প টিকে আছে। এবার যেন এক পিস চামড়াও নষ্ট না হয় বরং লবণ দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ করা যায় সেই লক্ষ্যে ফ্রি লবণ দেওয়াসহ বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মানসম্মত চামড়ার বিকল্প নেই। বিশেষ করে এলডব্লিউজি (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) সনদ না থাকা সত্ত্বেও ট্যানারিগুলো যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে পচনমুক্ত চামড়া বড় ভূমিকা রাখে। তিনি জোর দিয়ে বলেন,পশু জবাইয়ের ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করতে হবে। এটি না করলে চামড়ায় পচন ধরতে পারে এবং মান নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে ট্যানারিগুলো সঠিক দাম দিতে পারে না।
তিনি জানান, ট্যানারিগুলো কুরবানির সময় পর্যাপ্ত চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার জন্য প্রস্তুত থাকে। তবে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এবং পানির ব্যবস্থাপনা নিয়ে সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে সরকারকে বেশি নজর দিতে হবে।
বিনামূল্যে লবণ দেওয়া হবে : সরকার এবার স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র সংগ্রহকারী এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কসাই এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মাদ্রাসা ও এতিমখানার সংশ্লিষ্টদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
পাচার রোধে কড়াকড়ি : ঈদ-পরবর্তী কয়েকদিন সীমান্ত অভিমুখে চামড়াবাহী ট্রাক চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। এছাড়া চামড়ার সরকার নির্ধারিত দাম নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার পরিদর্শন করা, স্থানীয় পর্যায়ে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং ধর্মীয় সভায় চামড়া সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে। সিন্ডিকেট করে যাতে দাম না কমাতে পারে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা হবে।
২০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চামড়া নিয়ে এই বিশাল কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর্থিক সংকট যাতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেজন্য অর্থ বিভাগ দ্রুততার সঙ্গে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ২০ কোটি টাকা ছাড় করার কথা জানিয়ে বাণিজ্য সচিবকে চিঠি দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এই অর্থ মূলত ব্যয় করা হবে-উপকরণ সহায়তা বিশেষ করে সারা দেশে লবণ কেনা ও বিতরণের জন্য ভর্তুকি হিসাবে। প্রচারণা প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণায়। কসাই ও সংগ্রহকারীদের জন্য মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা পরিচালনা করা হবে। লজিস্টিক সাপোর্ট ও চামড়া সংগ্রহের ট্রাক ও অস্থায়ী সংরক্ষণাগার তদারকি বাড়াবে সরকার। এদিকে বাংলাদেশে কুরবানির চামড়ার একটি বড় অংশ মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক জ্ঞান না থাকায় এসব চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। সরকার এবার এসব প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি প্রকল্পের আওতায় এনেছে।
মাদ্রাসাগুলোর প্রতিনিধিরা মনে করছেন, সরকারের এই উদ্যোগের ফলে তাদের সংগৃহীত চামড়া যেমন ভালো থাকবে, তেমনি তারা ন্যায্য দাম পাওয়ার বিষয়েও আশাবাদী হতে পারছেন। সরকারের এই কঠোর অবস্থান চামড়াশিল্পে নতুন আশার সঞ্চার করলেও কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে পরিবহণ ব্যবস্থা এবং ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, এবার ট্যানারি মালিকদেরও কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হবে যাতে তারা যথাসময়ে কাঁচা চামড়া কেনে এবং মূল্য পরিশোধ করে।


