পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে
বাংলাদেশে মোট রাজস্ব আহরণের প্রায় ৭৮ শতাংশেরও বেশি আসে পরোক্ষ কর থেকে।
ফলে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশে ভারসাম্যপূর্ণ কর ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। সহজে রাজস্ব পেতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) পরোক্ষ করের ওপরই নির্ভর করে আসছে। এটি একদিকে রাজস্ব সংগ্রহে সহায়তা করলেও অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসায়িক খরচ ও জটিলতা বাড়ছে। এ ধরনের কর কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে।
কর-সংক্রান্ত বাজেট আলোচনায় গতকাল এ কথা বলেন বক্তারা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ‘পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরশীলতা: অর্থনীতির ওপর বহুমুখী প্রভাব’ শীর্ষক এ সভার আয়েজন করে নাগরিক প্লাটফর্ম ভয়েস ফর রিফর্ম।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরে সরকারের বাজেট অর্থায়নে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়েছে। যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পরোক্ষ কর সরকারের মোট করের ৫০ শতাংশের নিচে, সেখানে বাংলাদেশে বর্তমানে পরোক্ষ কর প্রায় ৮০ শতাংশ; এটি এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ।’
এই কর বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ‘পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরতার প্রধান কারণ আয়করের মতো প্রত্যক্ষ কর আহরণে ব্যর্থ হচ্ছে এনবিআর। এজন্য সহজ পথ হিসেবে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পণ্যের ওপর অগ্রিম আয়কর তত্ত্বীয়ভাবে প্রত্যক্ষ কর হলেও বাস্তবে এটিও পরোক্ষ কর। পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করতে ভ্যাট ও কাস্টমস শুল্কের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই ৫ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়ে গিয়েই পড়ে।’ সাম্প্রতিক সময়ের উচ্চমাত্রার মূল্যস্ফীতির পেছনে এ ধরনের কর কাঠামোও দায়ী বলেও মন্তব্য করেন স্নেহাশীষ বড়ুয়া।
এ সময় কর কাঠামো সংস্কারে তিনি কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে যৌক্তিক ভ্যাট হার নির্ধারণ, অগ্রিম ও উৎসে করের চাপ কমানো, কর ব্যবস্থার সরলীকরণ, ই-ইনভয়েসিং চালু ও নগদহীন লেনদেন উৎসাহিত করা।
দেশে অধিকাংশ পণ্য ও সেবার মূসক ১৫ শতাংশ। এ হার কোনোভাবেই ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন এনবিআরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ ফরিদউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কর কাঠামোর সংস্কার নিয়ে যে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল, সেখানে সর্বোচ্চ ভ্যাট হার ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। সে সময় আরো কিছু প্রস্তাব করলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেগুলো নিয়ে আর কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি।’
মোহাম্মদ ফরিদউদ্দিন আরো বলেন, ‘সরকার দেশের আর্থিক কাঠামোকে ডিজিটাল করতে চায়। কিন্তু ভ্যাট, কাস্টমস ও আয়করের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক স্থাপন না করলে ডিজিটাইজেশন করে কোনো লাভ হবে না।’
সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় দরকার বলে মনে করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালক ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, ‘শুধু রাজস্ব আহরণ বাড়ালেই চলবে না, রাজস্ব খরচের গুণগত ব্যাপারেও দৃষ্টি দিতে হবে। সরকারি পে-স্কেল অবশ্যই বৃদ্ধি করা দরকার, তবে বর্তমান চ্যালেঞ্জিং প্রেক্ষাপটে নতুন পে-স্কেলের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করা ভুল সিদ্ধান্ত হবে।’
সভাটি সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। এ সময় প্লাটফর্মটির পক্ষ থেকে বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সাধারণ ভ্যাট হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি নির্ধারণ করা উচিত নয়। বিলাসপণ্যের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রণয়ন, ব্যবসার অগ্রিম আয়কর মূল্যায়ন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর উঠিয়ে নেয়া, মোবাইল ফোনের টক টাইমের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বিলোপ এবং বাজেটে করের আওতা বাড়িয়ে প্রত্যক্ষ করের অংশ ৪০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন।’
আলোচনায় আরো অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ ও সহকারী অধ্যাপক ড. রুশাদ ফরিদী, বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইমরান হাসান, ইউনিলিভার বাংলাদেশের সাবেক হেড অব ট্যাক্স সাঈদ আহমেদ খান, ভ্যাট ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. আব্দুর রউফ প্রমুখ।


