ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ আছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা
দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটলেও নগদ অর্থের ব্যবহার কমেনি। বরং ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বাড়তে বাড়তে ইতিহাসের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। জুন ও জুলাইয়ে এমন নগদ অর্থের পরিমাণ আরো বেড়েছে। ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের স্থিতি এখন ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে।
নগদ অর্থের ছড়াছড়ি এমন সময়ে বাড়ছে, যখন দেশের ব্যাংক খাতে পেমেন্ট ব্যবস্থা অনেক বেশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। গ্রাহকরা চাইলে ঘরে বসেই ব্যাংকে যেকোনো অংকের অর্থ লেনদেন করতে পারছেন। ব্যাংকের অ্যাপস কিংবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে যখন খুশি কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছেন।
ডিজিটাল পেমেন্টের অবকাঠামো, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হলেও নগদ অর্থ এত দ্রুত বাড়ছে কেন—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসছে দেশের বড় অনানুষ্ঠানিক খাত, নগদনির্ভর ব্যবসা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ব্যাংক খাত নিয়ে আস্থার সংকট। অনেক ক্ষেত্রেই ডিজিটাল লেনদেন নগদের বিকল্প হয়নি; বরং নগদ অর্থের সঙ্গে সমান্তরালভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে আধুনিক পেমেন্ট প্রযুক্তির বিস্তার সত্ত্বেও নগদনির্ভরতা কমাতে না পারা বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকেই সামনে আনছে।
অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বলছেন, নগদ অর্থের বড় অংশ ব্যাংকের বাইরে থাকলে তা আর্থিক ব্যবস্থার কার্যকর প্রবাহে যুক্ত হয় না। এতে ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের সক্ষমতা কমে। ঋণ ও বিনিয়োগে অর্থের জোগান সংকুচিত হয়। উৎপাদনশীল খাতে অর্থপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বিপুল নগদ অর্থ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার, কর ফাঁকি, অপ্রদর্শিত আয় ও অবৈধ লেনদেনের ঝুঁকি বাড়ায়। অর্থনীতির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও দুর্বল হয়।
নগদ অর্থের প্রবাহ এতটা বেড়ে গেল কেন সেটি খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পেমেন্ট ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে ইনফরমাল ইকোনমির (অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি) আকার ছোট হয়ে আসার কথা। কিন্তু আমরা সেটি দেখছি না। বরং ব্যাংকের বাইরে চলে যাওয়া নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়ছে। আবার ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে। একদিকে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়া, অন্যদিকে আমানতের প্রবৃদ্ধি হওয়া পরস্পরবিরোধী। অর্থনীতির এ দুই ধারা পরস্পরবিরোধী। কেন এমনটি হচ্ছে, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।’
ড. ফাহমিদা খাতুন নিজেও এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইনফরমাল ইকোনমি বড় হয়ে ওঠার অর্থ হলো কোনো না কোনো উৎস থেকে টাকা আসছে। সে টাকা বৈধ উৎসের কিনা, সে অর্থের বিপরীতে কর পরিশোধ হয়েছে কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। সাধারণত কোনো অর্থনীতিতে ব্যাংকের প্রতি অনাস্থা, ঘুস-দুর্নীতি ও কালো টাকার দৌরাত্ম্য বেড়ে গেলে নগদ অর্থের চাহিদা বাড়ে।’


