এনবিআরের কাছে ৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চায় চট্টগ্রাম বন্দর
চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে ১৯৯৩ সালে আমদানি করা পণ্যভর্তি কনটেইনার এখনো পড়ে আছে।
আইন অনুযায়ী, জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক পণ্য গ্রহণ না করলে তা কাস্টমসের মাধ্যমে নিলাম বা ধ্বংস করার কথা। কিন্তু তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিপুলসংখ্যক অখালাসকৃত কনটেইনারের নিষ্পত্তি না হওয়ায় বন্দরের ধারণক্ষমতার একটি বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে রয়েছে। এতে অপারেশনাল সক্ষমতা কমার পাশাপাশি রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, অখালাসকৃত কনটেইনার বছরের পর বছর বন্দরে পড়ে থাকায় গত তিন দশকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার নিট রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে চিঠি দিয়েছে চবক। একই সঙ্গে নিলাম আইন সংস্কার, অখালাসকৃত কনটেইনার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বন্দরের ইয়ার্ড খালি করতে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাবও দিয়েছে।
বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন অখালাসকৃত কনটেইনার পড়ে থাকায় কনটেইনার ইয়ার্ডের ব্যবহারযোগ্যতা কমছে, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বাড়ছে, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের উৎপাদনশীলতা কমছে এবং দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বিপজ্জনক রাসায়নিক ও দাহ্য পণ্য দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকায় অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে।
চলতি মাসে কাস্টমস কমিশনারকে পাঠানো এক চিঠিতে এসব ঝুঁকির কথা তুলে ধরে দ্রুত নিলাম ও ধ্বংস কার্যক্রম সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে চবক। চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস না হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে বাই-পেপারের মাধ্যমে কাস্টমসের কাছে কনটেইনার হস্তান্তর করে। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সময়মতো নিলাম ও ধ্বংস কার্যক্রম শেষ করতে না পারায় ইয়ার্ড ও শেডে নিলামযোগ্য পণ্যের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
বন্দরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে পি-শেডে ২৭৫ প্যাকেজ রাসায়নিক ও অন্যান্য বিপজ্জনক পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১২৫ প্যাকেজ দীর্ঘদিন ধরে নিলাম বা ধ্বংসের অপেক্ষায়। এছাড়া বিভিন্ন ইয়ার্ডে ৩৩০ টিইইউ বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ টিইইউ অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
এছাড়া বন্দরে পড়ে আছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টিইইউ ৪০ ফুট দীর্ঘ এফসিএল কনটেইনার, প্রায় ৩ হাজার ২০ ফুট দীর্ঘ এফসিএল কনটেইনার, ১ লাখ ১৭ হাজার প্যাকেজ এলসিএল কার্গো এবং সাত হাজার প্যাকেজ বাল্ক কার্গো। এসব কনটেইনার ও পণ্য দীর্ঘদিন ইয়ার্ডের মূল্যবান জায়গা দখল করে রাখায় বন্দরের অপারেশনাল সক্ষমতা কমছে এবং পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও মুখপাত্র মো. নাসির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কেবল পণ্য সংরক্ষণের স্থান নয়, এটি একটি চলমান অপারেশনাল ব্যবস্থা। তাই নিলাম ও ধ্বংসযোগ্য পণ্য বছরের পর বছর পড়ে থাকার বিষয়টিকে কেবল বন্দরের সমস্যা হিসেবে নয়, জাতীয় বাণিজ্য সক্ষমতার বিষয় হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিপজ্জনক পণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই বিষয়টি নিয়ে আমরা নিয়মিতভাবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি এবং দ্রুত নিলাম ও ধ্বংস কার্যক্রম সম্পন্ন করার অনুরোধ জানিয়েছি।’
এদিকে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো পৃথক এক চিঠিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৯৯৩ থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত কাস্টমসের কাছে হস্তান্তর করা ১০ হাজার ২২৫ টিইইউ নিলামযোগ্য কনটেইনার এখনো ইয়ার্ডে পড়ে রয়েছে। এসব কনটেইনার বন্দরের মোট ধারণক্ষমতার প্রায় ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে। এতে বন্দরের রাজস্ব আয় যেমন কমছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।


