ডিজিটাল লেনদেনের ৭৮% হয় এমএফএসে
দেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মাত্র ৪৩ শতাংশের ব্যাংক বা মোবাইল মানি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। আর ডিজিটাল লেনদেনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর হার মাত্র ৩৪ শতাংশ। বিপরীতে চীনে এ হার প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে দেশে ডিজিটাল লেনদেনের ৭৮ শতাংশই হয় মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার (এমএফএস) মাধ্যমে। এ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা লেনদেন করা হয়।
রাজধানীর গুলশানে গতকাল আয়োজিত এক কর্মশালায় এ তথ্য জানান গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। ‘টুওয়ার্ড আ ক্যাশলেস ইকোনমি: আ স্ট্র্যাটেজিক রোডম্যাপ ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজন করে পিআরআই।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট ঋণের ৭৫ শতাংশ যাচ্ছে মাত্র ১ শতাংশ অ্যাকাউন্টে। আর ৭৮ শতাংশ ঋণ ও ৬৫ শতাংশ আমানত কেন্দ্রীভূত ঢাকা ও চট্টগ্রামে। মূলত নগদনির্ভরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অর্থনীতিতে এ বৈষম্য রয়ে গেছে।’
ড. আশিকুর রহমান আরো বলেন, ‘কর আদায় বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও অবৈধ আর্থিক প্রবাহ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের লেনদেনের খরচ কমাতে নগদবিহীন অর্থনীতি তৈরির বিকল্প নেই। মোবাইল মানি, ডিজিটাল ব্যাংক, কিউআর পেমেন্ট ও ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট সিস্টেমকে কেন্দ্র করে সমন্বিত নীতিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নগদবিহীন লেনদেনের অর্থনীতির দিকে এগোতে পারবে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘দেশে ব্যাংকগুলোর প্রায় ১২ হাজার শাখা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ এসব শাখায় টাকা পৌঁছানো ও দেখভাল করতে বিপুলসংখ্যক লোকের কাজ করতে হয়। এগুলোর আর্থিক মূল্যমান প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এ টাকার ব্যয় কমানো ও জনগণের লেনদেন সুবিধা নিশ্চিত করতে আমাদের নগদবিহীন লেনদেনের দিকে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। এজন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি আমাদের মানসিকতাও পরিবর্তন করতে হবে।’
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘জিডিপি প্রবৃদ্ধি নির্ধারণে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধি, পুঁজি বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি। নগদবিহীন অর্থনীতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে, তবে এই অর্থনীতিতে সৃষ্ট মূল্যায়নগুলো যথাযথভাবে ধারণ করা প্রয়োজন। ডিজিটাল ও নগদবিহীন লেনদেনের মাধ্যমে সৃষ্ট মূল্যকে জাতীয় উৎপাদনে প্রতিফলিত করতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) জাতিসংঘের সিস্টেম অব ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস (ইউএন এসএনএ) ২০২৫ গ্রহণ করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে।’
অনুষ্ঠানে বলা হয়, ডিজিটাল পেমেন্ট স্কেলে চীন ও ভারতের অগ্রগতি বাংলাদেশ থেকে বহু গুণ এগিয়ে। চীনে এক বিলিয়নের বেশি মানুষ আলিপে ও অন্যান্য অ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত লেনদেন করে। ২০২৭ সালের মধ্যে দেশটিতে নগদ লেনদেন ৩ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভারতে ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) দৈনিক ৬৪ কোটি লেনদেন নিষ্পত্তি করছে, যা বৈশ্বিক রিয়েলটাইম ডিজিটাল পেমেন্টের প্রায় ৫০ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশে চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। এখানে ডিজিটাল লেনদেনের প্রধান ভরকেন্দ্র মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা এমএফএস। এসব মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ লেনদেন হয়। যদিও এসব লেনদেনের অধিকাংশই ছোট অংকের ও নগদ উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত। এ ব্যবস্থাও পুরোপুরি নগদবিহীন সমাজের পথে বড় বাধা বলে দাবি করেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার, গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার ও নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশিদ আলম।


