প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নে বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনা
ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে একটি দেশের অবস্থান অনেকাংশেই নির্ধারিত হবে এসব প্রযুক্তিকে কতটা কার্যকরভাবে উৎপাদনশীলতা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগানো যাচ্ছে তার ওপর।
উন্নয়নের সংজ্ঞা সময়ের সঙ্গে বদলায়। একসময় একটি দেশের অগ্রগতি পরিমাপ করা হতো সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা অন্যান্য দৃশ্যমান অবকাঠামো বিস্তারের মাধ্যমে। এখন সেই সূচকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়—ডিজিটাল সংযোগ, তথ্যের ব্যবহার, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উদ্ভাবন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে একটি দেশের অবস্থান অনেকাংশেই নির্ধারিত হবে এসব প্রযুক্তিকে কতটা কার্যকরভাবে উৎপাদনশীলতা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগানো যাচ্ছে তার ওপর।
AKIJ Advertisement
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ সেই পরিবর্তনকে আরো ত্বরান্বিত করছে। উৎপাদন, পরিবহন, আর্থিক সেবা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সরকারি সেবাসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। গত কয়েক দশকে গড়ে ওঠা ডিজিটাল অবকাঠামোর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এখন আরো উৎপাদনশীল, দক্ষ ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ডিজিটাল অগ্রগতি কেবল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বা সংযোগের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। মূল প্রশ্ন হলো এ সংযোগ ও প্রযুক্তি দেশের উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়াচ্ছে, ব্যবসার ব্যয় কতটা কমাচ্ছে এবং নাগরিকসেবাকে কতটা সহজ ও কার্যকর করছে। প্রযুক্তির প্রকৃত মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দক্ষতা বাড়ায় এবং মানুষের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখেছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে আইসিটি খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। এরই মধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আর্থিক সেবার বিস্তার থেকে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সরকারি সেবায় পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। ক্লাউড কম্পিউটিং, উন্নত নেটওয়ার্ক, তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং এআইয়ের সমন্বিত ব্যবহার এ রূপান্তরকে আরো গভীর করতে পারে।
বাণিজ্য ও শিল্প খাতে এর সম্ভাবনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের বড় ভূমিকা রয়েছে। এসব ব্যবসা ডিজিটাল লেনদেন, ই-কমার্স ও অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে এরই মধ্যে নতুন ক্রেতা ও বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে। এর সঙ্গে এআই-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ, আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা যুক্ত হলে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত আরো দ্রুত ও তথ্যনির্ভর হতে পারে। এতে ব্যয় কমার পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বাড়বে।
শিল্প খাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদনশীলতার নতুন সুযোগ তৈরি করছে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, সম্ভাব্য ত্রুটি আগেই শনাক্ত করা, যন্ত্রপাতির পূর্বাভাসভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং তথ্যনির্ভর উৎপাদন পরিকল্পনা এখন আধুনিক শিল্প ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের শিল্পে এসব প্রযুক্তির বিস্তার অপচয় এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনের মান ও দক্ষতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে।
সমান্তরালভাবে শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নে প্রযুক্তির গুরুত্বও দিন দিন বাড়ছে। সব শিক্ষার্থী একই পদ্ধতি বা গতিতে শেখে না। এআই শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও সক্ষমতার ভিত্তিতে আরো ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে অনলাইন শিক্ষাসামগ্রীর বিস্তার শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার সুযোগের ব্যবধান কমাতে সহায়তা করতে পারে। ভবিষ্যতের কর্মবাজারে নিয়মিত নতুন দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য হয়ে উঠবে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে এবং মানুষের কাছে দ্রুত সেবা পৌঁছে দিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য নথি রোগীর চিকিৎসা-ইতিহাস সহজলভ্য করে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। এআইয়ের যথাযথ প্রয়োগ রোগ শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।


