১৪ বছরের ব্যবধানে চিংড়ি রফতানি কমেছে ৬২%
আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রথাগত উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে দেশের হিমায়িত চিংড়ি খাতে সংকট গভীর হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ উৎপাদনশীল ও কম দামের ‘ভেনামি’ জাতের চিংড়ির ক্রমবর্ধমান চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ এখনো প্রথাগত ‘বাগদা’ চিংড়ির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ১৪ বছরের ব্যবধানে দেশের চিংড়ি রফতানি কমেছে প্রায় ৬২ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), মৎস্য অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) তথ্যানুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার টন চিংড়ি রফতানি হয়েছিল, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫৭ কোটি ডলার। আর সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ১৯ হাজার টনে, যা থেকে আয় হয়েছে ২৮ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ ১৪ বছরের ব্যবধানে চিংড়ির রফতানি কমেছে প্রায় ৩১ হাজার টন বা ৬২ শতাংশ এবং বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমেছে ২৮ কোটি ৪৪ লাখ ডলার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ২৩ হাজার ২৩৮ টন চিংড়ি রফতানি হয়েছিল, যা আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে ৪ হাজার ৭ টন ও ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার বেশি ছিল। তবে সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবার বড় পতন ঘটেছে। এক বছরের ব্যবধানে রফতানি কমেছে ৪ হাজার ২৩৮ টন এবং আয় কমেছে ১ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে মোট ৪৪ কোটি ৩৪ লাখ ২০ হাজার ডলার মূল্যের হিমায়িত মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৪৪ কোটি ১৫ লাখ ৮০ হাজার ডলারে তুলনায় মাত্র ১৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার বা দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি। এ অর্থবছরে ২৮ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ডলারের হিমায়িত চিংড়ি, ৯ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের হিমায়িত মাছ এবং ৬ কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার ডলারের মৎস্যজাত পণ্য রফতানি হয়। অর্থাৎ মৎস্যজাত পণ্য বাদ দিলে হিমায়িত মাছ রফতানি আয়ের প্রায় ৭৫ দশমিক ২১ শতাংশই এসেছে চিংড়ি থেকে।
রফতানিকারকরা বলছেন, দেশের চিংড়ি রফতানি মূলত বাগদাকেন্দ্রিক। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভেনামি চিংড়ি ছাড়া অন্য চিংড়ির চাহিদা কম। বিশেষত চীন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পর্তুগাল, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মতো দেশে বাগদার সামান্য চাহিদা থাকায় তারা চাহিদা অনুযায়ী তা আমদানি করেন। তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে বাগদা আমদানি প্রতি বছরই কমছে। ভেনামি জাতের চিংড়ির বাজারমূল্য কম ও হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেশি হওয়ায় ইউরোপের বাজারে চাহিদার পাশাপাশি গ্রাহক চাহিদাও বাড়ছে। তবে বাংলাদেশে সুযোগ থাকলেও পুরনো বাগদা চিংড়ি নিয়েই পড়ে আছেন ব্যবসায়ীরা। যদি ভেনামি জাতের চিংড়ির উৎপাদন ও রফতানির উদ্যোগ না নেয়া হয়, তাহলে দেশের চিৎড়ি রফতানি খাত ধ্বংস হয়ে যাবে বলে মনে করছেন তারা।
রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এমইউ সি ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈশ্বিক বাজারে চিংড়ি রফতানির কর্তৃত্ব অনেক আগেই হারিয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে ভেনামি জাতের চিংড়ির চাহিদা বেশি থাকলেও আমরা সেই সুযোগ নিতে পারিনি। বাগদা চিংড়ি রফতানি নিয়েই এখনো পরিকল্পনা চলছে। সরকার এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সেগুলো মাঠে প্রয়োগ না হওয়ায় রফতানিতে খুব বেশি আশার জায়গা তৈরি করতে পারেনি মৎস্য খাত।’ সরকার নজর না দিলে মৎস্য খাতের প্রধান রফতানি পণ্য চিংড়ি শুধু দেশের বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভেনামি চিংড়ি উৎপাদনে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি দেশ উদ্যোগ নিয়েছে, এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া অন্যতম। দেশটির পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের পূর্ব সুম্বা জেলায় প্রায় ২ হাজার ১৫০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করে সরকারিভাবে ওয়াইংগাপু সমন্বিত চিংড়ি চাষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এ প্রকল্পে বছরে প্রায় ৫২ হাজার টন চিংড়ি উৎপাদন ও সাত হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। প্রকল্পটিতে সরকারের বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন রুপিয়া (ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রা) বা ৩৯ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা আছে। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বা ২২ কোটি ১৪ লাখ ডলারের উৎপাদনমূল্য অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ইন্দোনেশীয় সরকারের।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য অধিদপ্তরের আওতাধীন কক্সবাজার জেলার চকোরিয়া-রামপুরা মৌজায় চিংড়ি জোন হিসেবে ঘোষিত সাত হাজার একর অনাবাদি জমিতে কোনো চিংড়ি উৎপাদন হয় না। জমিগুলো রফতানিকারকদের দীর্ঘমেয়াদে লিজ দিয়ে চিংড়ি চাষের সুযোগ দেয়া হলে দেশের রফতানি চিত্র পুরোপুরি বদলে যেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএফএফইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারিকুল ইসলাম জহির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইউরোপের বাজারে আমরা যেসব বাগদা চিংড়ি রফতানি করি তার দাম বেশি হওয়ায় সেখানে ভেনামি চিংড়ির চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে সেখানে আমরা রফতানিতে পিছিয়ে পড়ছি। অন্যদিকে ছোট আকারের চাকা চিংড়ি (কেজিতে ৩০ পিস) ভারত, ইন্দোনেশিয়া বা ভিয়েতনাম ৪-৫ ডলারে বিক্রি করলেও আমাদের স্থানীয় বাজারে তা ৭ ডলারের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে দেশীয় চিংড়ির চাহিদা বেশি। সে কারণে আমাদের উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।’
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে মৎস্য খাতে ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। এখন কীভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় অর্থ বরাদ্দ দেয়া হবে সে বিষয়ে আলোচনা চলছে।’
বিএফএফইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন, ‘জমি কিনে বিনিয়োগ করার সুযোগ আমাদের নেই। এজন্য সরকার যদি জমি লিজ দেয়, তাহলে আমরা সেখানে বিনিয়োগ করে উৎপাদন বাড়াতে কাজ করব। পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা মাঠ পর্যায়ের চাষীদের সব ধরনের লজিস্টিক সুযোগসহ বিনিয়োগ করবেন এবং চাষীদের নিশ্চয়তা দেয়া হবে তাদের থেকে ব্যবসায়ীরা সেই উৎপাদিত পণ্য কিনে নেবে। এভাবে না হলে চিংড়ি খাতে উন্নতি করা সম্ভব না।’ এছাড়া কক্সবাজারের চিংড়ি চাষের জন্য ঘোষিত সাত হাজার একর জমি প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বরাদ্দ দিলে খাতটি আবারো ঘুরে দাঁড়াবে বলেও দাবি করেন তিনি।
জানা যায়, দেশে আগে ১২২টি প্রতিষ্ঠান চিংড়ি ও মৎস্য জাতীয় পণ্য রফতানির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন তা ৩০-৩৫টিতে নেমে এসেছে। বাকিগুলো হয় বন্ধ হয়ে গেছে বা কারখানা ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। এসব কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা চার লাখ টনের বেশি ছিল। অন্যদিকে দেশে সব মিলিয়ে ২ লাখ ৬২ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের চিংড়ির চাষাবাদ হয়। ভেনামি চিংড়ির হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বাগদার তুলনায় ১০-১২ গুণ বেশি। অথচ দেশে ভেনামি চিংড়ির উৎপাদন এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে বড় আকারে বাগদা রফতানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের রফতানি খাত। অন্যদিকে সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদের কারণে হেক্টরপ্রতি বাগদার উৎপাদনও কমে আসছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় অভ্যন্তরীণ বাজারে ভালো দাম থাকলেও চিংড়িকে বিশ্ববাজারে টিকিয়ে রাখতে সনাতন চাষাবাদ থেকে সরে এসে বৃহৎ পরিসরে সরকারি নীতি প্রণয়ন ও ভেনামি চাষ নিশ্চিত করা জরুরি।


