পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতের উন্নয়নে একগুচ্ছ প্রস্তাব
দেশের পুঁজিবাজার, ব্যাংক খাত এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের–নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদ এসব প্রস্তাব তুলে ধরে।
বৈঠকে দেশের বর্তমান পুঁজিবাজার পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতের চলমান চ্যালেঞ্জ, সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় দেশের আর্থিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ডিবিএর পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে আট দফা সমন্বিত নীতিগত প্রস্তাব দাখিল করা হয়।
ডিবিএর প্রস্তাবে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের বাজারভিত্তিক পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে করদাতার অর্থ ব্যবহার করে বারবার ব্যাংক পুনর্মূলধনীকরণের তীব্র বিরোধিতা করেছে সংগঠনটি বলছে এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। এর পরিবর্তে বাজারভিত্তিক বিনিয়োগ, একীভূতকরণ ও বেসরকারি অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।
বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে ডিবিএর প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ব্যাংক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে। তাই বড় ঋণের বিকল্প হিসেবে বন্ড ও ইকুইটির মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা হলে পুঁজিবাজার শক্তিশালী হবে এবং ব্যাংকের ওপর থেকে চাপ কমবে।
সরকারি সিকিউরিটিজে সাধারণ বিনিয়োগকারী, ব্রোকার ও নন-পিডি ব্যাংকের অংশগ্রহণ বাড়ানো হলে বাজারে তারল্য সরবরাহ ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে ডিবিএ।
কর আইন ও মূলধন সংরক্ষণ নীতির অসামঞ্জস্য দূর করার প্রস্তাব দিয়ে ডিবিএ বলছে রিটেইন্ড আর্নিংস ও স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূলধন শক্তিশালীকরণে বাধা সৃষ্টি করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে দ্রুত সমন্বয় প্রয়োজন। ঋণখেলাপিদের মতো বন্ডখেলাপিদের তথ্যও সিআইবিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে ডিবিএ। এতে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে এবং খেলাপি সংস্কৃতি কমবে।
দেশের পুঁজিবাজারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ‘টি+১’ সেটলমেন্ট পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে লেনদেনের ঝুঁকি কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ দ্রুত পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছে ডিবিএ। দেশীয় সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট প্লাটফর্ম চালু হলে আন্তর্জাতিক গেটওয়ের ওপর নির্ভরতা এবং লেনদেন ব্যয়—উভয়ই কমবে, যা ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে ত্বরান্বিত করবে বলে ডিবিএর প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড খাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ও তারল্য বৃদ্ধিতে বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে ডিবিএ।
বৈঠকে ডিবিএর উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। একই সঙ্গে তিনি দেশের আর্থিক খাতের টেকসই উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠক শেষে ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম দেশের আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ইতিবাচক নেতৃত্ব এবং সাম্প্রতিক সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন, সংস্কার ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ডিবিএ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবে


